সারাবিশ্ব

ইরানের হামলায় অচল হতে পারে একাধিক দেশের ইন্টারনেট


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম

ইরানের হামলায় অচল হতে পারে একাধিক দেশের ইন্টারনেট
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেটা সেন্টার, সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোয় হামলা চালানো হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি। তার এই বক্তব্য ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে ইন্টারনেট যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যবসা, ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিভিন্ন দেশের ইন্টারনেট যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে একাধিক দেশ একযোগে সমস্যায় পড়তে পারে।

কেন ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্যের ইন্টারনেট অবকাঠামো?

বিশ্বের বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য অল্প কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এসব পথে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে ডেটা পরিবহনের সক্ষমতার বড় একটি অংশ লোহিত সাগরের তলদেশে থাকা সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

এসব ক্যাবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইয়েমেন ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশ করেছে। সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে প্রায় ২৬ কিলোমিটার প্রশস্ত এই প্রণালি আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য ও ডিজিটাল যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে সামরিক সংঘাত, নাশকতা কিংবা অন্য কোনো কারণে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিকে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

সমুদ্রতলের ক্যাবল বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জাহাজের নোঙরের আঘাত, সমুদ্রের তলদেশে দুর্ঘটনা কিংবা পরিকল্পিত নাশকতার কারণে এসব ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাবল মেরামত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। মেরামতকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচল, প্রয়োজনীয় অনুমতি এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার সুযোগ না থাকলে পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে, ডেটা সেন্টার হলো এমন বিশেষায়িত স্থাপনা, যেখানে অসংখ্য সার্ভার ও নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের মাধ্যমে ব্যাংকিং অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ক্লাউড সেবা, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পরিষেবা পরিচালিত হয়। এসব স্থাপনা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, শীতলীকরণব্যবস্থা ও উচ্চগতির টেলিযোগাযোগ সংযোগ প্রয়োজন।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, কোনো ডেটা সেন্টারের সব সার্ভার ধ্বংস না করেও হামলার মাধ্যমে পুরো স্থাপনাটিকে অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব। বিদ্যুৎ সরবরাহ, শীতলীকরণব্যবস্থা কিংবা টেলিযোগাযোগ সংযোগের যেকোনো একটি গুরুতরভাবে ব্যাহত হলে কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ইরানের হুঁশিয়ারিতে নতুন উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের মধ্যে প্রযুক্তি অবকাঠামোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে গুগল, মাইক্রোসফট ও ওরাকলের ক্লাউড অবকাঠামোর নাম সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় উল্লেখ করেছে।

একই মাসে আইআরজিসির টেলিগ্রাম পোস্টে গুগল, মেটা ও অ্যাপলসহ ১৭টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের নামও উঠে আসে। তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান জি৪২-এর নামও ছিল।

বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, মোহসেন রেজায়ির হুঁশিয়ারিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। তবে কোনো অঞ্চলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা এবং পরিকল্পিতভাবে পুরো ডিজিটাল অবকাঠামো ধ্বংস করার সক্ষমতা এক বিষয় নয়।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের হুমকির লক্ষ্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের মুখে ফেলা নয়; বরং সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলোকেও নতুন সামরিক অভিযান নিরুৎসাহিত করার বিষয়ে প্রভাবিত করা। কারণ, এসব দেশের অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনা মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

আগেও হামলার শিকার হয়েছে ডেটা সেন্টার

মধ্যপ্রাচ্যের প্রযুক্তি অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা কেবল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয়। এর আগে অঞ্চলটির একাধিক ডেটা সেন্টার ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

মার্চে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের দুটি স্থাপনা সরাসরি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। বাহরাইনে তাদের আরেকটি স্থাপনার কাছেও হামলার কারণে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

এসব ঘটনার সময় আবুধাবি কমার্শিয়াল ব্যাংক জানিয়েছিল, তথ্যপ্রযুক্তিগত বিঘ্নের কারণে তাদের অ্যাপ ব্যবহার করতে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছিল গ্রাহকদের। তবে ব্যাংকটি সরাসরি এডব্লিউএসের স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতিকেই সমস্যার কারণ হিসেবে নিশ্চিত করেনি।

পরবর্তী সময়ে এডব্লিউএস জানায়, বাহরাইনের কয়েকটি স্থাপনা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি স্থানে তাদের সেবা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে সময় লেগেছে। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা কঠিন।

ক্রিগের মতে, তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন হামলার মাধ্যমেও শত শত কোটি ডলারের যন্ত্রপাতি থাকা স্থাপনার কার্যক্রম ব্যাহত করা সম্ভব। ফলে অল্প কয়েকটি হামলা সফল হলেও সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতি ও ডিজিটাল পরিষেবায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

সমুদ্রতলের ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হলে কী হতে পারে?

লোহিত সাগরে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখানে তিনটি ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ডেটা সেন্টার ডায়নামিকসের প্রতিবেদনে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বলা হয়, হুতিদের হামলায় অচল হয়ে পড়া রুবিমার নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজের নোঙরের আঘাতে ক্যাবলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। সেগুলো মেরামত করতে কয়েক মাস সময় লেগেছিল।

তবে ওই ঘটনায় হুতিরা পরিকল্পিতভাবে ক্যাবল কাটার চেষ্টা করেছিল-এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গোষ্ঠীটি ওই ক্ষয়ক্ষতির দায়ও অস্বীকার করেছিল।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের জেদ্দার কাছে আরও দুটি ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। তবে ক্যাবল দুটি কী কারণে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

এ ধরনের ঘটনা দেখায়, সরাসরি সামরিক হামলা ছাড়াও দুর্ঘটনা কিংবা অজ্ঞাত কারণে সমুদ্রতলের ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।

বাব আল-মানদেব প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ

ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী সরাসরি সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবলে হামলা চালিয়েছে-এমন নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে বাব আল-মানদেব প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকায় সংঘাত বাড়লে ক্যাবলগুলোর নিরাপত্তা এবং মেরামত কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ডিজিটাল যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত তীব্র হলে সমুদ্রতলের ক্যাবল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিকল্প যোগাযোগপথের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে এবং ডেটা পরিবহনের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের দাবি যাচাই করা ছাড়া সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিকল্প ইন্টারনেট রুট তৈরির উদ্যোগ

লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আঞ্চলিক সরকার বিকল্প স্থলভিত্তিক যোগাযোগপথ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব প্রকল্পের ব্যয় বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ ও সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন।

ইরাকের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইরাকের ভূখণ্ড হয়ে তুরস্কের মাধ্যমে ইউরোপে ডেটা পরিবহনের জন্য কাতারভিত্তিক টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ওরেদুর সঙ্গে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিত এই যোগাযোগপথ বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রতলের ক্যাবলের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।

মাইক্রোসফটও মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রতলের ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য হলো, একটি যোগাযোগপথ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য পথ ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পরিষেবা সচল রাখা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করতে হলে একই ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে বিকল্প ডেটা সেন্টার, ব্যাকআপ সার্ভার এবং একাধিক স্বাধীন ইন্টারনেট সংযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে

তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর উপসাগরীয় দেশগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জি৪২, ওপেনএআই ও এনভিডিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ‘স্টারগেট ইউএই’ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। বৃহৎ এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার এই উদ্যোগ দেশটিকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ।

সৌদি আরবও এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। দেশটির সরকারি বিনিয়োগ তহবিল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ২০২৫ সালের মে মাসে ‘হুমেইন’ নামে একটি এআই প্রতিষ্ঠান চালু করে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং আরবি ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি করা।

এদিকে, কাতারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলও মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্লু আউলের সঙ্গে ডেটা সেন্টার খাতে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে।

তবে আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়ন বদলে যেতে পারে। নতুন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিকল্প যোগাযোগপথ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ক্রিগের মূল্যায়ন, ইরানের হুমকি উপসাগরীয় দেশগুলোর এআই খাতে অগ্রযাত্রা পুরোপুরি থামিয়ে দেবে না। তবে এর ফলে বিনিয়োগের ব্যয়, অবকাঠামোর অবস্থান নির্বাচন এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কোন দেশ?

আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে। কারণ, দেশটির এআই ও ডিজিটাল অর্থনীতির পরিকল্পনা মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত বাড়লে এসব অবকাঠামো কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকায় কাতার কিছু ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশটির ডিজিটাল অবকাঠামো সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রযুক্তি অবকাঠামো এখন শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম নয়; এটি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতারও অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট ক্যাবলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টার কিংবা সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন, ক্লাউডভিত্তিক সফটওয়্যার, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পরিষেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হলে ডেটা অন্য পথে পাঠাতে হতে পারে। এতে ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া, যোগাযোগে বিলম্ব এবং কিছু পরিষেবায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে। তবে বিকল্প ক্যাবল ও নেটওয়ার্ক সচল থাকলে সব দেশ বা সব ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে-এমন নয়।

ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বিস্তৃত। কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অচল হয়ে পড়লে তার ওপর নির্ভরশীল ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি পরিষেবা ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম সমস্যায় পড়তে পারে। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে আক্রান্ত স্থাপনার গুরুত্ব, বিকল্প ব্যবস্থা এবং পরিষেবা পুনরুদ্ধারে কতটা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায় তার ওপর।

সব মিলিয়ে, ইরানের হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি বাণিজ্য কিংবা সামুদ্রিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তবে ইরানের একটি হামলাতেই বহু দেশের ইন্টারনেট পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট ভিত্তি নেই। বরং গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল ও ডেটা সেন্টারের ওপর নির্ভরতা, বিকল্প যোগাযোগপথের সক্ষমতা এবং সংঘাতের বিস্তারের ওপর নির্ভর করবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা। তাই ভবিষ্যতে ডিজিটাল পরিষেবা সচল রাখতে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ব্যাকআপ ব্যবস্থা, একাধিক ইন্টারনেট সংযোগ এবং দ্রুত মেরামতের সক্ষমতা গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।