সারাবিশ্ব
‘অনাহারে মরতে চাই না’: ভারতে জ্বালানি সংকটে শহর ছাড়ছে হাজারো শ্রমিক
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ফলে এই শ্রমিকরা এখন নিজেদের গ্রাম বা ছোট শহরগুলোতে ফিরে যাচ্ছেন।
দিল্লির প্রধান রেলস্টেশনে ভিড় জমাচ্ছেন অভিবাসী শ্রমিকরা। পিঠে বড় আকারের ব্যাগ নিয়ে তারা রাজধানী ছাড়ছেন। কাজের সন্ধানে একসময় এই শহরেই এসেছিলেন তারা। এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই দিনমজুর ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
যারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন, তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকি তারা এখন দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। শহর ছাড়ার এই হিড়িক মূলত সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। এই সংকটের মূলে রয়েছে রান্নার গ্যাস। জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
এর জেরে ভারতে এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। সিলিন্ডার গ্যাস এখন দুষ্প্রাপ্য ও দামি পণ্যে পরিণত হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তবুও হরমুজ প্রণালী বন্ধ রয়েছে এবং বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
গ্যাসের এই তীব্র সংকটের কারণে অনেক ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া ভয়াবহ পরিস্থিতির এটি মাত্র একটি উদাহরণ।
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন নির্মাণ শ্রমিক লাখে চৌহান। টানা দুই সপ্তাহ কাজ না পেয়ে তিনিও বিহারের নিজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। দিল্লিতে একটি ছোট দুই কক্ষের বাসায় তিনি তার ছেলে, পুত্রবধূ এবং তাদের দুই সন্তানের সঙ্গে থাকতেন।
তিনি বলেন, 'এখানকার ঘরগুলো এমনিতেই খুব ছোট। কাঠখড়ি দিয়ে রান্না করার কোনো সুযোগ নেই। অন্তত বিহারে গেলে আমরা চুলায় (মাটির তৈরি সনাতনী চুলা) রান্না করতে পারব।'
চৌহান জানান, কোভিড লকডাউনের পর এটি দ্বিতীয়বারের মতো তাকে শহর ছাড়তে বাধ্য হতে হচ্ছে। তৃতীয়বার তিনি আবার শহরে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। এখানে গ্যাস নেই, কাজ নেই এবং কোনো আশাও নেই। আমরা এখানে না খেয়ে মরতে চাই না, কারণ প্রতিদিন বাইরের খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।
২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী শ্রম মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশের ৫ কোটি ৪০ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখই দিল্লিতে থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর ধরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। ভারতে দীর্ঘ ১৫ বছর পর এই প্রথমবারের মতো নতুন করে আদমশুমারির কাজ শুরু হয়েছে। আর ঠিক এই সময়েই বহু মানুষ তাড়াহুড়ো করে শহর ছাড়ছেন।
উত্তরপ্রদেশের বাদাউনের বাসিন্দা ও গৃহকর্মী আশা কুমারী তার গ্যাস সিলিন্ডার প্রায় ফুরিয়ে আসায় বিকল্প উপায় খুঁজছেন। কোভিড মহামারিতে স্বামীকে হারানো এই নারী একাই দুই সন্তানের ভরনপোষণ করেন।
তিনি বলেন, 'আমি গ্যাস বাঁচিয়ে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।' বর্তমানে তিনি দিনে মাত্র একবার রান্না করছেন জানিয়ে বলেন, 'মাঝে মাঝে আমি যেসব বাসায় কাজ করি, সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া খাবার পাই, যা আমাকে সাহায্য করে।'
তিনি জানেন যে এভাবে বেশিদিন চলা সম্ভব নয় এবং সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে গেলে তাকেও শহর ছাড়তে হবে।
এদিকে ভারত সরকার দাবি করছে, দেশে এলপিজি সরবরাহ স্থিতিশীল ও পর্যাপ্ত রয়েছে এবং কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
গত সোমবার দেশটির পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় জানায়, ১ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১৮ কোটি এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়েছে, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বর্তমানে ৯৭ শতাংশ গ্যাস বুকিং অনলাইনে হচ্ছে এবং জালিয়াতি রোধে প্রায় ৯০ শতাংশ সরবরাহ 'ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড' বা ওটিপি-র মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
তবে এই সুবিধাগুলো কেবল বৈধ সংযোগ থাকা গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য, যার জন্য বাসস্থানের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। কিন্তু অভিবাসী শ্রমিকদের কাছে এমন কোনো প্রমাণপত্র থাকে না।
সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার বিষয়টি সরকার সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনগণকে শান্ত থাকার এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের কারণে 'কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে'।
মোদি কোভিড লকডাউনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, 'কোভিড মহামারির সময় জাতি যেভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিল, এখনো সেভাবে প্রস্তুত ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কোভিড সংকটের সময় আমরা একইভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিলাম। এখন আবার আমাদের সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে।'
প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য অনলাইনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে 'ইন্ডিয়া লকডাউন অ্যাগেইন' (ভারতে আবার লকডাউন) বিষয়টি শীর্ষ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার পর অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সরকার একটি স্বস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। সাধারণ পরিচয়পত্র ব্যবহার করেই তাদের ৫ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও শ্রমিক অধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংকট দেশের কাঠামোগত গভীর ঘাটতিগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
'ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন কমিটি ফর ইরাডিকেশন অব বন্ডেড লেবার'-এর আহ্বায়ক নির্মল গোরানা এই পরিস্থিতিকে একটি বিপর্যয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি ১৯৭৯ সালের 'ইন্টারস্টেট মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কমেন অ্যাক্ট'-এর অধীনে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের সঠিকভাবে নিবন্ধিত করতে সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার বিষয়টি তুলে ধরেন। এই আইনটি মূলত শ্রমিকদের নিয়োগ ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, 'সরকার শ্রমিকদের সঠিক ও নির্ভুল নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পারছে না, যা অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি চরম অবিচার। রাষ্ট্র যদি এই কাজটি সঠিকভাবে করতে পারে, তবে শহরের চাকায় গতি রাখা এই অদৃশ্য শ্রমশক্তির মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় প্রাথমিক পদক্ষেপ হবে।'
যারা বাড়ি ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের শহর ছাড়ার এই ঢল সামাল দিতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গোরানা।
তিনি আরও বলেন, 'বিভ্রান্তি এড়াতে কাউন্সেলিং, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং জনসম্মুখে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া উচিত। এই মুহূর্তে মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, আর আতঙ্কিত হওয়াটা এখানে অবধারিত। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক।'