সারাবিশ্ব
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান চীনের, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষ বার্তা
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছে চীন। সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম না নিলেও চীনের এই বক্তব্যকে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা রক্ষা, স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা পরিহার এবং সংঘাত ও মুখোমুখি অবস্থান এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান।
হান ঝেং বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বিশ্বের বড় দেশগুলোর বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তাদের উচিত আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে চলা, আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। তাঁর বক্তব্যে উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পায়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে চীনের এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বক্তব্যে চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করেনি। একইভাবে তাইওয়ান ইস্যুতেও হান ঝেং সরাসরি কোনো বক্তব্য দেননি। এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন তিনি।
জাতিসংঘের একই বক্তব্যে চীন কিউবার বিরুদ্ধেও শক্তি প্রয়োগের হুমকি বন্ধ এবং দেশটির ওপর আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানায়। এ ক্ষেত্রেও হান ঝেং কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ‘সংশ্লিষ্ট দেশকে’ এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
চীনের এই অবস্থান সামনে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকের পরপরই। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই নেতার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ দেখা যায়। শি জিনপিংয়ের সফরে সামরিক বিমান মহড়া এবং রাষ্ট্রীয় ভোজসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক আয়োজনও ছিল। এর মাত্র একদিন পর জাতিসংঘে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
এদিকে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে আলোচনাও হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় শি জিনপিংকে ইরানকে সহায়তা না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। চীনও যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে যে তারা ইরানকে এ ধরনের সহায়তা দেবে না। এর আগে চীনের পক্ষ থেকে ইরানকে কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ এবং স্যাটেলাইট তথ্য দিয়ে সহায়তা করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যেই চীন নিজেকে সরাসরি সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধান, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার পক্ষে অবস্থান হিসেবে তুলে ধরছে।
চীনের সর্বশেষ বক্তব্য তাই একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের পরও ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে চীনের নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে।