সারাবিশ্ব
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা প্রশ্নে গণভোট সোমবার, কানাডার ঐক্য রক্ষায় কার্নির আহ্বান
কানাডার আলবার্টা প্রদেশে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা ও বিতর্ক তীব্র হয়েছে। প্রদেশটি কানাডার অংশ হিসেবে থাকবে, নাকি বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে ভবিষ্যতে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে-এ প্রশ্নে সোমবার (১৯ অক্টোবর) ভোট দেবেন আলবার্টার বাসিন্দারা। এরই মধ্যে প্রদেশটিকে কানাডার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কানাডার ঐক্য ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আলবার্টার নির্বাচন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর থেকে গণভোটের আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা চলে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত। সোমবার ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত ভোটগ্রহণ। এবারের ব্যালটে রয়েছে মোট ১০টি প্রশ্ন। এর মধ্যে দশম প্রশ্নটি আলবার্টার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে, আলবার্টা কানাডার প্রদেশ হিসেবে থাকবে, নাকি কানাডার সংবিধান অনুযায়ী বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে একটি বাধ্যতামূলক প্রাদেশিক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
তবে এবারের ভোটে সরাসরি স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ভোট পড়লেও আলবার্টা তাৎক্ষণিকভাবে কানাডা থেকে আলাদা হয়ে যাবে না। বরং পরবর্তী সময়ে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের জন্য আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ছাড়া অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, ভোটার পরিচয় যাচাই এবং প্রাদেশিক ক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আরও নয়টি প্রশ্ন রয়েছে ব্যালটে।
গণভোটকে সামনে রেখে গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ক্যালগেরিতে ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ সমাবেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। সেখানে তিনি আলবার্টার বাসিন্দাদের কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। কার্নির মতে, বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ কানাডার জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করার পাশাপাশি আলবার্টার অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তিনি ভোটারদের গণভোটের অন্যান্য প্রশ্নেও সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।
কার্নি বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল ও বিভক্ত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কানাডার অভ্যন্তরীণ বিভাজন নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। তাঁর বক্তব্য, কানাডা ঐক্যবদ্ধ থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ বাড়বে। তবে আলবার্টার বাসিন্দাদের মধ্যে ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
এদিকে, আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথও প্রদেশটিকে কানাডার অংশ হিসেবে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা বণ্টন, অভিবাসন এবং অন্যান্য নীতিগত বিষয়ে আলবার্টার আরও শক্তিশালী অবস্থান থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা করলেও প্রাদেশিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রশ্নে স্মিথের অবস্থান কার্নির সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। ফলে কানাডার সঙ্গে থাকার প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান কাছাকাছি হলেও অন্যান্য নীতিগত বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাপন্থীদের অভিযোগ, প্রদেশটির বিপুল জ্বালানি সম্পদ ও অর্থনৈতিক অবদানের তুলনায় ফেডারেল সরকারের নীতিতে তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিশেষ করে তেল ও গ্যাসশিল্প, রাজস্ব বণ্টন এবং পরিবেশগত নীতিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন তাঁরা। তাঁদের একটি অংশ মনে করে, বিচ্ছিন্নতার প্রশ্ন সামনে এলে অটোয়ার সঙ্গে আলোচনায় আলবার্টার দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষের সমর্থকেরা জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরছেন। তাঁদের মতে, কানাডার বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে থাকলে আলবার্টা আন্তপ্রাদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং জাতীয় পর্যায়ের অবকাঠামো উন্নয়নের সুবিধা পেতে পারে। ফলে এবারের গণভোট শুধু আলবার্টার ভবিষ্যৎ নয়, কানাডার ফেডারেল কাঠামো ও প্রদেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করেছে।
আলবার্টার নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯ অক্টোবর ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনানুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার নির্ধারিত তারিখ ২৯ অক্টোবর। গণভোটের ফল প্রদেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে সমর্থন পাওয়া গেলেও স্বাধীনতার প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তী আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।