সারাবিশ্ব
পাকিস্তানে চীনের বৃহত্তম বন্দর প্রকল্প কি মুখ থুবড়ে পড়েছে?
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান উপকূলে অবস্থিত গওদর বন্দরকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াংকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি করিডোর গড়ে তোলার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার অগ্রগতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অস্ট্রেলিয়ার লোয়ি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে গওদর বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি এখনো চীনের প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে পারেনি; বরং নিরাপত্তা, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও আর্থিক ব্যয়ের কারণে এটি ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।
সিপিইসির ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্প গওদর
২০১৩ সালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পাকিস্তান সফরের সময় প্রকল্পটির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। সিপিইসির অন্যতম কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে চীনের পশ্চিমাঞ্চলকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা হয় গওদর বন্দরকে।
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি আরব সাগরের উপকূলে গওদরের অবস্থান চীনের কাছে বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। পরিকল্পনাটি ছিল, সমুদ্রপথে গওদরে পৌঁছানো পণ্য ও জ্বালানি পাকিস্তানের ভূখণ্ড দিয়ে স্থলপথে চীনের জিনজিয়াংয়ের কাশগর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। এতে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর নির্ভরতা এবং মালাক্কা প্রণালিকেন্দ্রিক দীর্ঘ সামুদ্রিক রুটের ঝুঁকি কিছুটা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এই উদ্দেশ্যে গওদরকে সড়ক, রেলপথ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর মাধ্যমে কাশগরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ওভারসিজ পোর্ট হোল্ডিং কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গওদরকে ঘিরে বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক এবং শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।
কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরও সেই পরিকল্পিত বাণিজ্যিক রূপান্তর পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
নিরাপত্তা সংকট গওদরের সবচেয়ে বড় বাধা
গওদর প্রকল্পের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে চীনা নাগরিক, প্রকৌশলী, কনভয় এবং সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।
বেলুচ লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ এবং এর মজিদ ব্রিগেড চীনা স্বার্থকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে গওদর পোর্ট অথরিটি কমপ্লেক্সে হামলা এবং একই বছরের অক্টোবরে করাচি বিমানবন্দরের কাছে চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলা প্রকল্পটির নিরাপত্তা ঝুঁকিকে আরও সামনে নিয়ে আসে।
চীনা প্রকৌশলী, পণ্যবাহী বহর ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে। সিপিইসি প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তায় স্পেশাল সিকিউরিটি ডিভিশনসহ বিভিন্ন বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু বিস্তৃত ও অস্থিতিশীল অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে বিপুলসংখ্যক কর্মী ও অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি গওদরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। চীনের জন্য বন্দরটির অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যয়ের বিষয়টিও এখন বড় বিবেচনায় পরিণত হয়েছে।
যে ভূগোল সুবিধা হওয়ার কথা ছিল, সেটিই বড় বাধা
গওদরের কৌশলগত অবস্থান একদিকে যেমন এর সম্ভাবনা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে চীন পর্যন্ত স্থলপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সেটিই বড় সমস্যা তৈরি করেছে।
গওদর থেকে চীনের জিনজিয়াং পর্যন্ত করিডোরকে কারাকোরাম পর্বতমালাসহ বিশ্বের অন্যতম দুর্গম ভূখণ্ড অতিক্রম করতে হয়। কারাকোরাম মহাসড়কের কিছু অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৬০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। এ অঞ্চলে ভূমিধস, তুষারধস এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ পণ্য নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিবহনের জন্য এই রুট পরিচালনা করা সহজ নয়।
করিডোরটি গিলগিট-বালতিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। এসব অঞ্চলের ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ আলাদা হলেও সবগুলোই স্থলপথে পণ্য পরিবহনের খরচ ও ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। গওদর থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চীনের পশ্চিমাঞ্চলে তেল বা অন্যান্য জ্বালানি স্থলপথে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘ পাইপলাইন, রেলপথ কিংবা সড়ক যোগাযোগ প্রয়োজন হবে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে এমন অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় অত্যন্ত বেশি।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের আগের বিশ্লেষণেও গওদর থেকে কাশগর পর্যন্ত প্রস্তাবিত তেল পাইপলাইনের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
বন্দর আছে, কিন্তু নেই প্রত্যাশিত বাণিজ্য
একটি বড় আন্তর্জাতিক বন্দর সফল করতে শুধু জেটি, ক্রেন বা টার্মিনাল নির্মাণ করলেই হয় না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত কার্গো, নিয়মিত জাহাজ চলাচল, শিল্পকারখানা, গুদাম, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক পশ্চাদভূমি।
গওদরের ক্ষেত্রে এই বাণিজ্যিক পরিবেশ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় গড়ে ওঠেনি।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত কার্গো না থাকায় বড় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো গওদরকে নিয়মিত প্রধান বাণিজ্যিক গন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করছে না। এর পরিবর্তে দুবাই, সালালাহ ও করাচির মতো প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক বন্দরগুলোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফলে বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগের পরও গওদর এখনো একটি ব্যস্ত আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হাবে পরিণত হতে পারেনি।
সমস্যা শুধু বন্দরের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নয়। গওদর শহর নিজেও দীর্ঘদিন ধরে পানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য মৌলিক অবকাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি। অর্থাৎ একদিকে আধুনিক বন্দর নির্মাণ করা হয়েছে, অন্যদিকে বন্দরের আশপাশের শহর এখনো প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ঘাটতিতে রয়েছে।
স্থানীয় জনগণের ক্ষোভও বড় হয়ে উঠছে
গওদর প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় জনগণের অসন্তোষও নতুন নয়। পানি ও বিদ্যুৎ সংকট, মাছ ধরার অধিকার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বন্দরের আশপাশে চলাচলের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ রয়েছে।
হক দো তেহরিক বা ‘গওদরের অধিকার আন্দোলন’ এসব দাবিতে একাধিকবার বিক্ষোভ করেছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে মাছ ধরার গুরুত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সমুদ্র এলাকায় বিধিনিষেধ এবং শিল্প পর্যায়ের মাছ ধরার কার্যক্রম নিয়ে জেলেদের উদ্বেগ রয়েছে।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের আগের বিশ্লেষণগুলোতেও পানি, বিদ্যুৎ, মাছ ধরার সুযোগ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে গওদরের স্থানীয় অসন্তোষের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে মূল সমস্যাটি হলো, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা স্থানীয় জনগণের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশ যদি মনে করে যে বন্দরের উন্নয়ন থেকে তারা পর্যাপ্ত সুবিধা পাচ্ছে না, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চীনের বিদেশি বিনিয়োগ কৌশলেও পরিবর্তন
গওদরের সমস্যা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বিদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ কৌশলও তুলনামূলকভাবে সতর্ক হয়ে উঠছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের শুরুর পর্যায়ে চীন বড় সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। এখন বেইজিং আর্থিকভাবে টেকসই, তুলনামূলকভাবে ছোট এবং নির্দিষ্ট ফল দিতে পারে—এমন প্রকল্পের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে অনেক সময় ‘স্মল ইজ বিউটিফুল’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে গওদরের মতো উচ্চ ব্যয় ও উচ্চ নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গওদর বন্দরের ৪০ বছরের ইজারা কাঠামো অনুযায়ী বন্দরের রাজস্বের ৯১ শতাংশ চীনের পাওয়ার কথা। কিন্তু বন্দরে যদি পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রমই না থাকে, তাহলে রাজস্ব ভাগাভাগির এই কাঠামো থেকেও প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা পাওয়া কঠিন।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটও বাড়াচ্ছে চাপ
গওদরের ভবিষ্যৎ শুধু চীনের জন্য নয়, পাকিস্তানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সিপিইসির আওতায় পাকিস্তানে সড়ক, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামোতে বিপুল অর্থায়ন করা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরতার মধ্যে রয়েছে।
এই অবস্থায় গওদরের মতো একটি প্রকল্পের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা পাকিস্তানের জন্যও কঠিন হয়ে উঠছে।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী বৈদেশিক লেনদেন সংকট এবং আইএমএফ সহায়তা ও চীনা ঋণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
বাণিজ্যের বাইরে বাড়তে পারে কৌশলগত গুরুত্ব
গওদরের গুরুত্ব শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি আরব সাগরে এর অবস্থান ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সামুদ্রিক স্বার্থের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন বিশ্লেষণে গওদরকে চীনা নৌযানের জ্বালানি সরবরাহ, রসদ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ সম্ভাব্য লজিস্টিক ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা এবং গওদরকে সরাসরি চীনা নৌঘাঁটিতে রূপান্তরের বিষয় এক নয়। লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন বিশ্লেষণেও বন্দরটির সম্ভাব্য সামুদ্রিক ও লজিস্টিক গুরুত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
সর্বশেষ বিশ্লেষণে লোয়ি ইনস্টিটিউট সম্ভাবনা হিসেবে বলেছে, গওদরের বিশাল বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সীমিত করে তুলনামূলক ছোট এবং কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি স্থাপনায় রূপ দেওয়ার পথ চীন বিবেচনা করতে পারে। এমন ক্ষেত্রে বন্দরটির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নৌযানের জ্বালানি ও লজিস্টিক সহায়তার মতো ব্যবহার গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এটিকে চীনের সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং বিশ্লেষণে উত্থাপিত সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
তাহলে গওদর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কী?
গওদরের মূল সমস্যা হলো, প্রকল্পটির প্রাথমিক সাফল্যের জন্য একাধিক শর্ত একই সঙ্গে পূরণ হওয়া প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তানে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, পর্যাপ্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, কার্যকর সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং চীনের ধারাবাহিক বিনিয়োগ-সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে এসব শর্তের বেশ কয়েকটি এখনো পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এর অর্থ এই নয় যে চীন শিগগিরই গওদর থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। বরং বর্তমান পরিস্থিতি থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো-গওদর নিয়ে বেইজিংয়ের হিসাব আগের চেয়ে বেশি বাস্তববাদী ও সতর্ক হতে পারে।
একসময় গওদরকে পাকিস্তানের ‘দুবাই’ বা ‘সিঙ্গাপুর’ হিসেবে গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরও বন্দরটি সেই মাত্রার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। লোয়ি ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ মূল্যায়নও দেখাচ্ছে, গওদরের সামনে এখন মূল প্রশ্ন বন্দরটি থাকবে কি না-তা নয়; বরং এটি কী ধরনের বন্দর হিসেবে টিকে থাকবে এবং এর জন্য চীন ও পাকিস্তান ভবিষ্যতে কতটা অর্থ ও নিরাপত্তা ব্যয় করতে প্রস্তুত থাকবে।
অর্থাৎ, গওদরের ভবিষ্যৎ হয়তো আর আগের সেই বিশাল বাণিজ্যিক মেগা-হাবের স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ছোট পরিসরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম, আঞ্চলিক লজিস্টিক সুবিধা এবং কৌশলগত ব্যবহারের সমন্বয়ে এর নতুন ভূমিকা তৈরি হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন বাস্তবে কতটা হবে, তা নির্ভর করবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বৃদ্ধি এবং চীনের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কৌশলের ওপর।