আইন আদালত
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় আজ
জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আজ সোমবার (১৭ নভেম্বর) ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করবেন।
এ মামলায় কী ধরনের শাস্তি হতে পারে-মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড—তা আজকের রায়ের ওপর নির্ভর করছে। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। আইনে এসব অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে আইনে সংশোধনী এনে আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, অভিযোগ প্রমাণিত হলে ট্রাইব্যুনাল আসামির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিতে পারে।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম জানান, অপরাধের মাত্রা ও সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি দিতে পারেন। রায়ে নারী–পুরুষ ভেদে বিশেষ ছাড়ের সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শুধু জামিনের ক্ষেত্রে নারী, অসুস্থ ব্যক্তি ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিশেষ বিবেচনা দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা। ট্রাইব্যুনালের সামনে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। আইনজীবী, সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হচ্ছে।
রায়ের অংশবিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করবে। অন্যান্য গণমাধ্যমও বিটিভির মাধ্যমে সম্প্রচার করতে পারবে।
মামলায় আনা পাঁচটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে। অভিযোগগুলো হলো—
১. উসকানিমূলক বক্তব্যের পর গণহত্যা: ২০২৩ সালের ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ‘রাজাকারের বাচ্চা’সহ উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র রাজনৈতিক কর্মীরা হামলা চালায়। এতে দেড় হাজার নিরস্ত্র ছাত্র–জনতা নিহত এবং প্রায় ২৫ হাজার আহত হন।
২. মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ : হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি এসব নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল এবং সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথোপকথনের অডিওতে এ নির্দেশের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি ধারায় অভিযোগ গঠন হয়েছে।
৩. রংপুরে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দায়ী করা হয়েছে।
৪. চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা : রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনরত ছয় নিরস্ত্র নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগেও একই তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
৫. আশুলিয়ায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা : আশুলিয়ায় ছয়জন নিরস্ত্র মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার দায়েও শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান এবং আইজিপিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের পর ৭ নভেম্বর থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, সব ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তাই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।