জাতীয়
কর্মসংস্থান ও শিল্পের চাহিদা মেটাতে পূর্ণাঙ্গ টিভেট ইকোসিস্টেম গড়ছে বাংলাদেশ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটালাইজেশন ও সবুজ প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ব শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা মোকাবিলায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণকে (টিভেট) বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সরাসরি সংযোগ স্থাপন এবং শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় টিভেট ইকোসিস্টেম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে জাতীয় বক্তব্য উপস্থাপনকালে এসব কথা বলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
তিয়ানজিনের মেইজিয়াং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত এ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘টিভেট: পরিবর্তনকে যৌথভাবে গ্রহণ, যৌথভাবে মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং যৌথভাবে ভবিষ্যৎ নির্মাণ’। উচ্চপর্যায়ের এ বৈশ্বিক সম্মেলনে ৪০টিরও বেশি দেশের শিক্ষামন্ত্রী, ১০০টিরও বেশি দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, ইউনেসকোর ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি, শিল্পখাতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এবং কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের শিক্ষামন্ত্রী হুয়াই জিনপেং, দেশটির স্টেট কাউন্সিলের ভাইস প্রিমিয়ার দিং শুয়েশিয়াং, তিয়ানজিনের মেয়র ঝাং গং, মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আহমাদ জাহিদ হামিদি এবং ইউনেসকোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগণ। মানবসম্পদই দেশের অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি। তাই পরিবর্তনশীল বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য।
টিভেটকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই শিক্ষাব্যবস্থা একাডেমিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের সংযোগ ঘটায়। একই সঙ্গে তরুণদের সম্ভাবনাকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করে।
ভবিষ্যতের অর্থনীতির চাহিদা পূরণে শুধু প্রথাগত একাডেমিক শিক্ষা যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ব্যবহারিক, প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। শিল্পখাতের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবন সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের টিভেট সংস্কার কার্যক্রম কেবল নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে পাঠ্যক্রম শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, শিক্ষকরা দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের দক্ষতা হালনাগাদ করবেন এবং শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে কাজের মাধ্যমে শিল্প-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। পাশাপাশি জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোকে কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ তৈরির সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষাব্যবস্থাকে উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত জুনে চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওই সফরে দুই দেশ শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীনের সফল অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের টিভেট খাত আধুনিকায়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প-সংযুক্ত ব্যবহারিক শিক্ষার প্রসারে কাজ চলছে।
সম্মেলনের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষামন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানান। প্রথমত, উদীয়মান প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও অভিযোজনক্ষম করতে হবে। দ্বিতীয়ত, টিভেটের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা, শ্রমবাজারের চাহিদা ও জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ কর্মজগতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, নিয়োগদাতা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও তরুণদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ-চীন যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব
সম্মেলনের ফাঁকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন চীনের শিক্ষা উপমন্ত্রী রেন ইউছুয়েনের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন, যৌথ কারিগরি শিক্ষা কর্মসূচি চালু, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনা সরকারি বৃত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশে একটি ‘বাংলাদেশ-চীন যৌথ কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
উভয় পক্ষ এসব অগ্রাধিকারমূলক সহযোগিতা উদ্যোগ বাস্তবায়নে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী কর্মী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।