জাতীয়

হাসিনার ফাঁস হওয়া অডিওতে গুলি চালানোর নির্দেশের সত্যতা নিশ্চিত করল বিবিসি (ভিডিও)


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৫, ১২:৫৭ পিএম

হাসিনার ফাঁস হওয়া অডিওতে গুলি চালানোর নির্দেশের সত্যতা নিশ্চিত করল বিবিসি (ভিডিও)
ছবি: সংগৃহীত

একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে শোনা গেছে—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি আই।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এই অডিওর সত্যতা নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি।

অডিও রেকর্ডিং অনুসারে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার গণভবনে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা একজন অজ্ঞাত পরিচয়ধারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছিলেন। ওই ফোনালাপে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়—“ঘটনাস্থলে যারা যাবে, প্রাণঘাতী অস্ত্র (lethal weapon) নিয়ে যাবে। যেখানেই পাবে, গুলি (shoot) করবে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সহিংস ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

বিবিসির অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় আন্দোলনকারীদের দমনে পুলিশ বাহিনী প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে এবং অনেক বিক্ষোভকারী নিহত হন। এসব ঘটনার সময় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পুলিশ সরাসরি গুলি চালাচ্ছে।

ফাঁস হওয়া অডিওটি বিশ্লেষণ করেছে ‘ইয়ারশট’ নামের একটি অডিও ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের মতে, রেকর্ডিংটিতে কোনো ধরনের সম্পাদনা বা কৃত্রিমতা পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো কক্ষে স্পিকারে চালানো ফোনালাপটি রেকর্ড করা হয়েছিল।

এই রেকর্ডিংকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ব্রিটিশ মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরামর্শক টবি ক্যাডম্যান বলেন, “এই রেকর্ডিং শেখ হাসিনার ভূমিকা প্রমাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পরিষ্কার, নির্ভরযোগ্য এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, বিবিসির দাবি করা অডিওটির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। দলটির এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, “যদি অডিওটি সত্যও হয়, সেটি ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একটি বৈধ প্রয়াস।” আওয়ামী লীগের দাবি, “সরকারি সিদ্ধান্তগুলো ছিল যথোপযুক্ত, সৎ এবং জানমাল রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপ।”

বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, ওই সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে অন্তত ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন মুখপাত্র জানান, “দুঃখজনকভাবে কিছু সদস্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বলপ্রয়োগ করেছে। এ নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে।”

ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যার নির্দেশ, বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও উসকানির অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন জানালেও সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। আন্তর্জাতিক আইনজীবী ক্যাডম্যানের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও পালনের পর বাংলাদেশে এখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকার আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ সম্ভব হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

এদিকে, জাতিসংঘ থেকে আসা তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশও আওয়ামী লীগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিবিসি সেনাবাহিনীর মন্তব্য জানতে চাইলেও এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।

এই অডিও ফাঁস এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব মোড় এনে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।