জাতীয়

হাদীকে হত্যাচেষ্টা: শুটারকে নিজেদের ‘এজেন্ট’ দাবি করে ভারতীয়দের উল্লাস


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৩৭ এএম

হাদীকে হত্যাচেষ্টা: শুটারকে নিজেদের ‘এজেন্ট’ দাবি করে ভারতীয়দের উল্লাস
ছবি: সংগৃহীত

অনলাইনে ও মোবাইল ফোনে দীর্ঘদিন ধরে হত্যার হুমকির মুখে থাকার মধ্যেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন, ১২ ডিসেম্বর ঢাকার ব্যস্ত সড়কে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদী।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পেছন দিক থেকে মোটরসাইকেলে আসা দুই সন্ত্রাসী তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওসমান হাদী বর্তমানে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

হত্যাচেষ্টার পর স্বাধীন অনুসন্ধানী গণমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট হামলাকারীদের পরিচয় ও ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। এ ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল এই হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেও বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ও ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের একটি অংশের মধ্যে।

দ্য ডিসেন্ট গত দুই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) বিশ্লেষণ করে ভারত থেকে পরিচালিত বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে, যারা ওসমান হাদীর ওপর হামলার ঘটনায় প্রকাশ্যে উল্লাস করেছে। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে হামলাকারীদের ভারতের স্বার্থরক্ষাকারী ‘এজেন্ট’ আখ্যা দিয়ে ধন্যবাদ জানানো হয় এবং হত্যাচেষ্টাকে ন্যায্য বলে প্রচার করা হয়।

একই সঙ্গে ওসমান হাদীর একটি ফেসবুক পোস্টকে বিকৃত ও ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে হত্যাচেষ্টাকে ‘প্রয়োজনীয়’ বলে সমর্থন জানানো হয়। ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিজেপিঘনিষ্ঠ ক্যাম্পেইন গ্রুপ Youth4Nation–TN Chapter-এর সাধারণ সম্পাদক মেজর (অব.) মাধান কুমার এক্সে দাবি করেন, ওসমান হাদী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দখল করে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ গড়তে চেয়েছিলেন এবং সে কারণেই তাকে গুলি করা হয়েছে। তার পোস্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি নিয়মিতভাবে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, শনিবার সকাল থেকেই সমন্বিতভাবে একাধিক ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে ‘ওসমান হাদী ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল দখল করতে চেয়েছিলেন’—এমন একই ধরনের দাবি ছড়ানো হয়। BhikuMhatre নামের একটি অ্যাকাউন্ট এক্সে এই দাবি করে একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্য যুক্ত করে, যেখানে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-কে প্রশংসা করা হয়। বহু পোস্টে #Dhurandhar হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে হামলাকারীদের ধন্যবাদ জানানো হয়।

উগ্র হিন্দুত্ববাদী অ্যাক্টিভিস্ট ও বিজেপি ক্যাম্পেইনার ড. রাজেশ পাটিল এক দীর্ঘ পোস্টে ওসমান হাদীর বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ তুলে দাবি করেন, একজন তথাকথিত #Dhurandhar তাকে তার ‘ভারতবিরোধিতার’ কারণে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি হুমকি দিয়ে লেখেন, যারা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলবে, #Dhurandhar তাদের ‘দেখে নেবে’। Bhakt Prahlad, TARUN এবং India Strikes নামের একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ভাষায় হুমকি ও উল্লাস প্রকাশ করা হয়।

উল্লেখ্য, #Dhurandhar মূলত ২০২৫ সালে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা একটি বলিউড স্পাই অ্যাকশন চলচ্চিত্রের হ্যাশট্যাগ, যেখানে পাকিস্তানি ‘সন্ত্রাস নেটওয়ার্কের’ বিরুদ্ধে ভারতের গোপন অভিযানের গল্প দেখানো হয়েছে। এই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে বাস্তব হত্যাচেষ্টাকে ভারতের গোপন অভিযানের সঙ্গে তুলনা করে উসকানি দেওয়া হচ্ছে।

‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গে ভারতীয় অপপ্রচার নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই এই অসত্য দাবি বারবার ছড়ানো হয়েছে। স্বাধীন ফ্যাক্টচেকার, গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার এই প্রচারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। ওসমান হাদীর একটি ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট বিকৃতভাবে ব্যবহার করে দাবি করা হয়, তিনি ভারতের মানচিত্র দখলের ইঙ্গিত দিয়েছেন; অথচ মূল ছবিতে ভারত ও বাংলাদেশের মানচিত্র আলাদা রঙে স্পষ্টভাবে দেখানো ছিল।

এ ছাড়া কোনো প্রমাণ ছাড়াই ওসমান হাদীকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টাও করা হয়েছে। কিছু পোস্টে সীমান্তে নিহত ফেলানী খাতুনের মতো ঝুলিয়ে হত্যার আহ্বান জানানো হয়, যা চরম সহিংসতা ও ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ।

হত্যাচেষ্টার আগে থেকেই আওয়ামী লীগপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট ও বিদেশি নম্বর থেকে ওসমান হাদী নিয়মিত হত্যার হুমকি পাচ্ছিলেন। ১১ নভেম্বর আওয়ামী লীগ অ্যাক্টিভিস্ট ডালটন সৌভাত হীরা ফেসবুকে সহিংসতার ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দেন, যেখানে সরাসরি ওসমান হাদীর নাম উল্লেখ করা হয়। এর দুই দিন পর, ১৪ নভেম্বর ওসমান হাদী নিজেই ফেসবুকে জানান, মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৩০টি বিদেশি নম্বর থেকে তাকে ফোন ও বার্তা পাঠিয়ে হত্যা ও অগ্নিসংযোগের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

হত্যাচেষ্টার পরপরই বিএনপি ও জামায়াতকে দায়ী করে ভিন্ন ভিন্ন অপপ্রচার চালানো হয়। আওয়ামীপন্থী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস ও জামায়াত নেতাদের জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর পোস্ট ছড়ানো হয়। এমনকি এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ব্যবহার করে হামলাকারীদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করা হয়।

তবে দ্য ডিসেন্ট-এর যাচাইয়ে এসব দাবির কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। প্রকৃত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীরা মুখে মাস্ক পরিহিত ছিল এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অনেক ছবি কৃত্রিমভাবে তৈরি বা বিকৃত।

সব মিলিয়ে, ওসমান হাদীর ওপর হত্যাচেষ্টাকে ঘিরে দেশি-বিদেশি একটি মহলের সমন্বিত অপপ্রচার, উল্লাস ও হুমকি বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।