জাতীয়

ইতিহাসের অন্যতম বিশাল চার্জশিট: রিজার্ভ চুরিতে অভিযুক্ত ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১০:৩১ এএম

ইতিহাসের অন্যতম বিশাল চার্জশিট: রিজার্ভ চুরিতে অভিযুক্ত ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রায় এক দশক পর গতি পেল দেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলা। মামলার তদন্ত শেষ করে খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আইনি মতামতের জন্য ইতোমধ্যে ১০ হাজার পৃষ্ঠার মামলার ডকেট ও খসড়া চার্জশিট অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

সিআইডি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়। হ্যাকাররা আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের সুইফট (SWIFT) ব্যবস্থায় ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে অর্থ সরিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করে। এরপর থেকেই মামলাটির তদন্ত করে আসছে সিআইডি।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কমিটির তত্ত্বাবধানে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয় এবং চলতি বছরের ১ এপ্রিল খসড়া চার্জশিট অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়।

খসড়া অভিযোগপত্রে ফিলিপাইনের ৩৬, উত্তর কোরিয়ার ২, চীনের ৩, শ্রীলঙ্কার ৮, ভারতের ৪, বাংলাদেশের ১০ এবং জাপানের ১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় শতভাগ তথ্য-প্রমাণ যাচাই ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই এই অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।

মামলার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, তদন্তের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা সম্পন্ন করেছিলেন। পরবর্তী তদন্তকারীরা দেশ-বিদেশ থেকে অতিরিক্ত তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেন। সবশেষে একটি নির্ভুল ও তথ্যভিত্তিক চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বর্তমানে তদন্তে আর কোনো কাজ বাকি নেই।

সিআইডির আরেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, তদন্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল হোতাকে শনাক্ত করা। বিভিন্ন ফরেনসিক তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়ক এবং তার নেতৃত্বাধীন কুখ্যাত ‘লাজারাস গ্রুপ’-কে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করে। পরে এফবিআইয়ের প্রতিবেদন সংগ্রহ করে প্রধান আসামি হিসেবে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের একটি বড় অংশ শনাক্ত ও জব্দের তথ্যও তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মামলার শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। চুরির ৪১ দিন পর মামলা হওয়ায় তদন্তকারীরা প্রকৃত ক্রাইম সিনে প্রবেশের সুযোগ পাননি। এর আগেই একটি বিদেশি আইটি প্রতিষ্ঠান এবং কয়েকজন অননুমোদিত ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করেছিলেন। তবুও সিআইডির তদন্ত দল দেশ-বিদেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ করে।

তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের অনুমতি নিয়ে আলামতগুলো সিআইডির আইটি ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া দিগুতির জবানবন্দিও গ্রহণ করা হয়, যেখানে তিনি কয়েকজন বিদেশি অভিযুক্তের সম্পৃক্ততার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, পারস্পরিক আইনগত সহায়তা (এমএলএআর) চুক্তির আওতায় বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাপ্ত নথি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে দেশীয় ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার পর তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ারও চেষ্টা হয়েছিল। তবে বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠনের পর তদন্ত আবারও গতি পায় এবং সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়।