সারাবিশ্ব

বিপুল সামরিক ব্যয়-অত্যাধুনিক অস্ত্র, তবু হুতি হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ সৌদি আরব


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫ এএম

বিপুল সামরিক ব্যয়-অত্যাধুনিক অস্ত্র, তবু হুতি হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ সৌদি আরব
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তি ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করেছে দেশটি। সামরিক শক্তিতে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ। একের পর এক হামলার ঘটনায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা, সামরিক কৌশল এবং নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) হিসাব অনুযায়ী, গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে সৌদি আরবের ব্যয় ছিল ৮৩ বিলিয়ন ডলার। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকে সংগৃহীত উন্নত সামরিক সরঞ্জাম সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বিপুল বিনিয়োগের পরও দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সব ধরনের হামলা থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিন দিক থেকে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি

সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ-তিন দিক থেকেই। সংঘাতের তীব্র পর্যায়ে ইরান দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার আশঙ্কা রয়েছে। এসব গোষ্ঠী সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নিয়ে হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জটি কেবল রাজধানী রিয়াদ কিংবা একটি তেল শোধনাগারকে সুরক্ষিত রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্র, শোধনাগার, পাইপলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানির সরবরাহব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা সম্ভব হলেও কিছু হামলা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে কোথায়, কীভাবে এবং কতটা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে সৌদি সামরিক কর্তৃপক্ষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

কৌশল বদলে আকাশ প্রতিরক্ষায় চাপ তৈরি করছে হুতিরা

সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে হুতিরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার করছে। এই কৌশলের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হামলার ধরনের কিছু মিল রয়েছে। রুশ বাহিনীও বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক ড্রোনের সঙ্গে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছে।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত ভূমির কাছাকাছি দিয়ে উড়তে পারে। ফলে ভূপ্রকৃতি ও রাডারের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে এগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, কিছু আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ ধরনের অস্ত্র মোকাবিলায় শুধু একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বরং বিভিন্ন ধরনের রাডার, আগাম সতর্কতা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।

হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইরানের সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে ইয়েমেনে ইরানি উৎসের ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, সামরিক সরঞ্জাম এবং চালকবিহীন আকাশযানের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এসব সরঞ্জাম ইয়েমেনে পৌঁছেছে, তা নিয়েও তদন্ত হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বাইরের উৎস থেকে অস্ত্র, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইরান ও হুতিদের মধ্যে সম্পর্কের প্রকৃতি এবং নির্দিষ্ট অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুতিদের ব্যবহৃত হেতেম-২ ও প্যালেস্টাইন-২ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানের তৈরি অস্ত্রের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। গত বছর ইসরায়েলের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানার ঘটনায় এসব অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগানোর কৌশল হুতিদের আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও নিজস্ব লক্ষ্য রয়েছে হুতিদের

দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নেতৃত্বাধীন কথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে পরিচিত হুতিরা। হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইরাকের বিভিন্ন ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক চাপের মুখে পড়লেও হুতিরা ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। তেহরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও গোষ্ঠীটির নিজস্ব রাজনৈতিক, সামরিক ও আঞ্চলিক লক্ষ্য রয়েছে। ফলে হুতিদের কর্মকাণ্ডকে কেবল ইরানের নির্দেশনার ফল হিসেবে দেখলে সংঘাতের জটিলতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেয়। দীর্ঘ সংঘাতে ইয়েমেনে ব্যাপক মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সংঘাতের তীব্রতা কমলেও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ পুরোপুরি মেটেনি। অর্থনৈতিক চাপ, অবরোধসংক্রান্ত অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বিরোধ পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে। সৌদি আরবের সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ক্ষতিপূরণের দাবিও সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে রিয়াদ ও হুতিদের মধ্যে আলোচনা শুরুর জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নিতে তেহরান সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে এখানে ইয়েমেনের পক্ষ হিসেবে মূলত হুতিদের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতির বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরব মধ্যস্থতার প্রস্তাব গ্রহণ করলেও হুতিরা দুই সপ্তাহ ও এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁর হুঁশিয়ারি, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে যে সমঝোতা সম্ভব, ভবিষ্যতে তা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

সামরিক অভিযান নাকি কূটনীতি-কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে রিয়াদ

হুতিদের হামলার আশঙ্কা বাড়লেও সৌদি আরব পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণকে সতর্ক করার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সম্পর্কে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। পরে তা আবার চালু করা হয় বলে রিয়াদের কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, সোমবার তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

হুতিদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোও সৌদি আরবের জন্য সহজ হবে না। বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটলে গোষ্ঠীটির সঙ্গে আলোচনায় বসা সৌদি নেতৃত্বের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। আবার বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান জোরদার করলে হুতিদের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে। তাঁর নেতৃত্বে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, পর্যটন ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সৌদি আরবের অর্থনীতি এখন শুধু তেল উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ, ডেটা সেন্টার, পানির লবণাক্ততা দূর করার কারখানা, বিমানবন্দর এবং পর্যটন অবকাঠামো দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব স্থাপনায় হামলা হলে উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা ও জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ ও স্থিতিশীল গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবের ভাবমূর্তি ধরে রাখাও তাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

স্থল অভিযানেও রয়েছে বড় ঝুঁকি

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে স্থল অভিযান চালিয়ে হুতিদের পরাজিত করা সৌদি আরবের জন্য সহজ হবে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। ইয়েমেনের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, হুতিদের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় এলাকায় তাদের শক্ত অবস্থান যেকোনো স্থল অভিযানকে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। অতীতের সংঘাতেও হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান অর্জন করা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রও হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে বিপুল ব্যয়ের মুখে পড়েছে। গত বছর হুতিদের বিরুদ্ধে সাত সপ্তাহের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অভিযানের পর লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধের বিষয়ে সমঝোতা হলেও ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকে। এ ছাড়া গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অত্যাধুনিক রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় হুতি নেতৃত্বের কয়েকজন সদস্য, কমান্ডার ও প্রযুক্তিবিদ নিহত হলেও গোষ্ঠীটির সামরিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এতে বোঝা যায়, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তাদের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন। স্থল অভিযান পরিচালনা করতে গেলে আরও বেশি জনবল, অর্থ, রসদ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হতে পারে।

যুদ্ধবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজের আশপাশে হুতিদের সামরিক তৎপরতা দেশটির সরকারি বাহিনীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। শহরটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ও যোগাযোগকেন্দ্র হওয়ায় এর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে ইয়েমেনের সংঘাত আরও জটিল হতে পারে। হুতিদের জনবল ও সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বড় ধরনের সংখ্যার উল্লেখ থাকলেও এসব হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব

হুতিদের হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক মিত্রদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সামরিক সহায়তার প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাকিস্তান ও মিসরের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং একাধিক দিক থেকে আসা হামলার কারণে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে নতুন অস্ত্র সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের মজুত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়। নতুন সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সীমাবদ্ধতা থাকলে মিত্র দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সৌদি আরবের জন্য শুধু অস্ত্র কেনাই যথেষ্ট নয়; এসব অস্ত্রের পর্যাপ্ত মজুত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্যকর ব্যবহারের সক্ষমতা বজায় রাখাও জরুরি।

ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের জন্যও বিষয়টি জটিল। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট সহায়তা না দিলে আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনকে সামরিক সহায়তা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মাইকেল র‍্যাটনির মতে, সংকটের সবচেয়ে কঠিন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহ থেকে মিত্রকে পরিত্যাগ করার ধারণা তৈরি হতে পারে। রিয়াদে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা র‍্যাটনির মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাজনৈতিক চাপের কারণে সৌদি আরবকে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কূটনীতির পথে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সেই সমাধান পুরোপুরি সন্তোষজনক না হলেও সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত কূটনীতিই কি একমাত্র পথ?

সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, বিপুল সামরিক বাজেট ও অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকলেই একটি দেশের সব ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি দূর করা যায় না। বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা, বিভিন্ন দিক থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করা এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুত ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ।

হুতিদের হামলা সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি দেশটির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। সামরিক অভিযান জোরদার করলে পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে, আর সমঝোতায় গেলে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন রিয়াদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে হয়তো সামরিক প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রাখতে হবে। কারণ, শুধু অস্ত্রের শক্তি দিয়ে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।