সারাদেশ
শালুক বিক্রিতেই চলে সংসার, ঘিওর হাটে জীবিকার লড়াই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের
মানিকগঞ্জের ঘিওর হাটে শালুক বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক নারী। বর্ষার শেষ দিকে খাল-বিল, নালা, ডোবা ও বিভিন্ন জলাশয় থেকে শালুক সংগ্রহ করে হাটবাজারে বিক্রি করেন তাঁরা। এই মৌসুমি আয়ের ওপর নির্ভর করেই পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন এসব নারী। তবে শালুকের মৌসুম শেষ হলে জীবিকার তাগিদে তাঁদের খুঁজতে হয় বিকল্প কাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঘিওর হাটে শালুকের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বেশ কয়েকজন নারী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঘিওর ইউনিয়নের গোলাপনগর-কুঠিবাড়ি এলাকার মায়া বিশ্বাস, উর্মিলা বিশ্বাস ও মালা বিশ্বাসসহ আরও অনেকে। তাঁদের কেউ সাধারণ শালুক প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন, আবার কেউ সিদ্ধি জাতীয় শালুক বিক্রি করছেন প্রতি কেজি ১৫০ টাকায়।
বিক্রেতারা জানান, সাধারণ শালুকের তুলনায় সিদ্ধি জাতীয় শালুক খেতে বেশি সুস্বাদু। এ কারণে বাজারে এর চাহিদা ও দামও তুলনামূলক বেশি। বর্ষার শেষ দিকে শালুক সংগ্রহের মৌসুম শুরু হলে তাঁরা বিভিন্ন জলাশয়ে নেমে শালুক তোলেন। পরে সেগুলো পরিষ্কার করে স্থানীয় হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। এ কাজের জন্য প্রয়োজন হয় পরিশ্রম ও সময়। তবু পরিবারের খরচ জোগাতে মৌসুমজুড়ে এই কাজ করে যেতে হয় তাঁদের।
ঘিওরে কর্মরত মিজানুর রহমান বলেন, ‘ছোটবেলায় নিজেরাই খাল-বিল থেকে শালুক সংগ্রহ করতাম। কিন্তু এখন তো পাওয়াই যায় না। মানিকগঞ্জে এক কেজি শালুকের দাম ২০০ টাকা। বাচ্চাদের চেনানো ও জানার জন্য ১০০ টাকা দিয়ে এক কেজি কিনে নিলাম। দেখতে যেমনই হোক, খেতে খুব সুস্বাদু।’
শালুক বিক্রেতা মায়া বিশ্বাস জানান, জলাশয় থেকে শালুক সংগ্রহ করে পরিষ্কার করার পর বিভিন্ন হাটে নিয়ে বিক্রি করেন তাঁরা। বুধবার ঘিওর হাটে এবং বৃহস্পতিবার বরংগাইল হাটে শালুক বিক্রি করেন। এ ছাড়া ঘিওর বাসস্ট্যান্ড, বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড এবং মানিকগঞ্জ শহরের বাসস্ট্যান্ড ও কাঁচাবাজারেও শালুক নিয়ে বসেন তাঁরা। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এসব স্থানে শালুক বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন।
শুধু শালুক সংগ্রহ ও বিক্রিই নয়, জীবিকা নির্বাহের জন্য এসব নারীর অনেকে কুঁচো মাছও ধরেন। খাল-বিল ও জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা মাছ বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করেন তাঁরা। শালুক ও মাছ বিক্রির আয় দিয়েই পরিবারের খাবার, দৈনন্দিন প্রয়োজনসহ অন্যান্য খরচ চালাতে হয় তাঁদের।
শালুক সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত নারীরা জানান, তাঁদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। অনেকেরই নিজস্ব জমিজমা নেই। কেউ খাসজমিতে বসবাস করেন, আবার কেউ থাকেন অন্যের আশ্রয়ে। ফলে জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁদের বিভিন্ন মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়। শালুকের মৌসুমে জলাশয় থেকে শালুক সংগ্রহ করে বিক্রি করলেও বছরের অন্য সময়ে কাজের ধরন বদলে যায়।
মৌসুম শেষ হলে তাঁদের কেউ কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, আবার কেউ অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। এভাবেই বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের শ্রম দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহের চেষ্টা করেন তাঁরা। তবে এসব কাজ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে পরিবারের সব প্রয়োজন মেটানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
শালুক বিক্রেতাদের ভাষ্য, শালুক সংগ্রহ ও বিক্রি তাঁদের স্থায়ী পেশা নয়; বরং সংসারের প্রয়োজন মেটানোর একটি মৌসুমি অবলম্বন। বর্ষার শেষ দিকে জলাশয় থেকে শালুক সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হলে তাঁরা এই কাজে নামেন। মৌসুম শেষ হলে আবারও বিকল্প কাজের সন্ধানে বের হতে হয়। জীবিকার এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন ঘিওরের এসব নারী।