জাতীয়

চুরি ও অনিয়ম ধরা পড়ায় আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার ৩২৫ বাংলাদেশি গবেষণাপত্র


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম

চুরি ও অনিয়ম ধরা পড়ায় আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার ৩২৫ বাংলাদেশি গবেষণাপত্র
ছবিঃ সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিভিন্ন গবেষণা সাময়িকী থেকে জালিয়াতি, ভুয়া পিয়ার রিভিউ, তথ্যের অসংগতি এবং চৌর্যবৃত্তির (প্লেজিয়ারিজম) মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিষয়টি দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

তদন্তে প্রকাশ, বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে অবস্থান উন্নত করা এবং গবেষণা প্রকাশের মাধ্যমে আর্থিক প্রণোদনা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু গবেষক অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেছেন। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সম্পাদকীয় তদন্তে এসব অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে। গবেষণা নীতিমালা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের গবেষকদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এর মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ৪৪টি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ৪২টি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২টি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ২১টি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি করে এবং ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি করে গবেষণাপত্রও প্রত্যাহারের তালিকায় রয়েছে।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও কয়েকজন গবেষকের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনা সামনে এসেছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খানের ২৬টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা প্রায় ৮০টি গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন, যা সে সময়ই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাগুলোর প্রতিটিতেই সৌদি আরবের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সহলেখক ছিলেন।

এছাড়া ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক মমিনুর রহমানের ক্যানসার, ন্যানোমেডিসিন ও কোভিড-১৯ বিষয়ক সাতটি গবেষণাপত্র স্প্রিঞ্জার ও এলসেভিয়ারের তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামানের সবুজ অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত ১১টি গবেষণাও জালিয়াতির অভিযোগে বাতিল হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো কমিটি অন পাবলিকেশন এথিকস (COPE)-এর নীতিমালা অনুসরণ করে তদন্ত পরিচালনা করে। এসব তদন্তে যেসব অনিয়ম সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ভুয়া বা কারসাজিপূর্ণ পিয়ার রিভিউ, গবেষণার তথ্য ও ফলাফলে অসংগতি, প্লেজিয়ারিজম, একই তথ্য বারবার ব্যবহার, অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে সাইটেশন বাড়ানো এবং অর্থের বিনিময়ে লেখকস্বত্ব বেচাকেনাকারী ‘পেপার মিল’-এর সংশ্লিষ্টতা।

এত বড় সংখ্যায় গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হলেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর জবাবদিহিতা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌফিকুল ইসলামের নয়টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের পরও বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট তদন্ত শেষে তাঁকে কেবল সতর্ক করে দায়িত্ব শেষ করেছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেছেন, কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ব্যর্থ হলে ইউজিসি নিজেই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, গবেষণায় অনৈতিক চর্চা রোধে কঠোর নজরদারি, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা আরও সংকুচিত হবে এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক জার্নালে দেশের গবেষকদের কাজ প্রকাশের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।