বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি
প্যারালাইসিস রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী ‘রোবোটিক হ্যান্ড স্যুট’ বানাল রোবোলাইফ
প্যারালাইসিসে আক্রান্ত মানুষের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্য নিয়ে অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে ‘রোবোলাইফ’ (Robolife) টিম। জোবরা গ্রামের সন্তান লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর গবেষক দল তৈরি করেছেন সাশ্রয়ী মূল্যের বিশেষ ‘রোবোটিক হ্যান্ড স্যুট’। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের হাত ও আঙুলের নড়াচড়া স্বাভাবিক করতে এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করাই এই প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য।
প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক রোগীর হাত ও আঙুলের স্বাভাবিক নড়াচড়া সীমিত হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক অক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি হারিয়ে যায় আত্মবিশ্বাসও। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রয়োজন হলেও অনেক রোগীর পক্ষে দীর্ঘদিন চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে থেরাপি নেওয়া সম্ভব হয় না। ব্যয়, দূরত্ব এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় ব্যায়াম থেকে বঞ্চিত হন।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই প্যারালাইসিস রোগীদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য ও তুলনামূলক কম খরচের একটি প্রযুক্তি তৈরির উদ্যোগ নেয় রোবোলাইফ টিম। লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর সহকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা, নকশা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ‘রোবোটিক হ্যান্ড স্যুট’ তৈরির কাজ এগিয়ে নেন। ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর সম্প্রতি তাঁরা ডিভাইসটির একটি প্রাথমিক প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
রোবোলাইফ টিমের তৈরি এই বিশেষ ডিভাইসটি রোগীর হাত ও আঙুলকে নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নড়াচড়া করতে সহায়তা করবে। রোগীর শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হাত ও আঙুলের বিভিন্ন ধরনের মুভমেন্ট করানোর মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের জড়তা কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় এটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত হাতের ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও সহজ ও ধারাবাহিক করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন উদ্ভাবকেরা।
গবেষকদের ধারণা, প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীদের হাতের নড়াচড়া অনুশীলনে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যায়ামের মাধ্যমে হাতের জড়তা কমানো, পেশির কার্যক্ষমতা ধরে রাখা এবং রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ডিভাইসটির চিকিৎসাগত কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন প্রয়োজন হবে।
রোবোলাইফ টিমের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিটিকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে। বর্তমানে বাজারে থাকা বিভিন্ন ধরনের রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন ডিভাইস তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশের অনেক রোগীর জন্য সেগুলো ব্যবহার করা কঠিন। সেই জায়গায় স্থানীয়ভাবে তৈরি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি প্যারালাইসিস রোগীদের পুনর্বাসন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্ভাবক লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর দল বলছেন, এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়; বরং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কিছুটা সহজ করে তাঁদের আত্মনির্ভরশীলতার পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। রোগী যেন নিজের বাড়িতেই নিয়মিত হাতের ব্যায়াম করার সুযোগ পান এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের সঙ্গে আরও সহজে যুক্ত থাকতে পারেন-সেই লক্ষ্যেই ডিভাইসটির উন্নয়ন করা হচ্ছে।
প্রাথমিক প্রোটোটাইপ তৈরির পর এখন এটিকে আরও উন্নত, নিরাপদ ও ব্যবহারবান্ধব করার কাজ চলছে। রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ডিভাইসটির কার্যকারিতা বাড়ানো, নকশায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা এবং বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে রোবোলাইফ টিম। পাশাপাশি চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এর পরবর্তী ধাপের উন্নয়ন করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তরুণ উদ্ভাবকদের এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের প্যারালাইসিস রোগীদের পুনর্বাসন ব্যবস্থায় নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। বিশেষ করে যেসব রোগীর নিয়মিত থেরাপি নেওয়া কঠিন বা ব্যয়বহুল, তাঁদের জন্য সাশ্রয়ী রোবোটিক প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। আর জোবরা গ্রামের সন্তান লাবলু বড়ুয়া ও তাঁর দলের এই উদ্যোগ প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর একটি অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।