জাতীয়
ককটেল বিস্ফোরণের ভিডিও পাঠালেই ৫-১০ হাজার টাকা, যোগাযোগে ভারতীয় নম্বর: ডিবি
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, চক্রটির সদস্যরা মলোটভ ককটেল বা হাতবোমা বিস্ফোরণের পর ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে নির্দিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠালে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন। এসব কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করে পরিচালিত বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, রাজধানীতে সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে নাশকতার এই অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ডিবির দাবি, ভারতে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতার নির্দেশনায় নাশকতার পরিকল্পনা ও সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে নাশকতা বাস্তবায়নে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে মাদকাসক্ত ও ভাসমান ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে ককটেল নিক্ষেপ বা বিস্ফোরণের কাজে যুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পদ-পদবি কিংবা অন্যান্য সুবিধার আশ্বাস দিয়েও তরুণদের এসব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
নাশকতার জন্য ব্যবহৃত বিস্ফোরক তৈরির ক্ষেত্রেও চক্রটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনা রয়েছে বলে দাবি পুলিশের। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এবং রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় ককটেল তৈরির কথিত গোপন কারখানার সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব স্থান থেকে নাশকতায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ উদ্ধারের বিষয়েও তদন্ত চলছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় ডিবি একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় বংশাল থানা ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক রায়হান উদ্দিনসহ ছাত্রলীগ কর্মী রাসেল খান, আলা উদ্দিন ও আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিনে যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ দনিয়া কাঁচাবাজার এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০টি হাতবোমা উদ্ধারের কথাও জানায় পুলিশ।
এর পরদিন, ১৯ সেপ্টেম্বর কমলাপুর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় শাহজাহানপুর থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন রায়হান ও যুবলীগ কর্মী মোহাম্মদ সানমুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে বোমাবাজির ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফকে মোটরসাইকেল ও ককটেলসহ গ্রেপ্তারের কথা জানায় ডিবি।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার রায়হান যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ডিবি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেনের নির্দেশে তারা সেখানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান বলে রায়হান জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে পরিচিত এক দোকানদারের কাছ থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বলেও জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবির দাবি, বিস্ফোরণ ঘটানোর পর ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে নির্ধারিত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানো হতো। ভিডিও পাওয়ার পর মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে নির্ধারিত অর্থ পাঠানো হতো। এভাবে প্রতিটি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য আলাদা করে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করা হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভারতে অবস্থান করছেন-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয় বলে সতর্ক করেছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির। তার মতে, রোমিং সুবিধা কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে ভারতীয় নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা সম্ভব। ফলে শুধু নম্বরের দেশ কোডের ভিত্তিতে ব্যবহারকারীর অবস্থান নিশ্চিত করা যায় না।
এদিকে, নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার সন্দেহে গত সোমবার রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে রবিউল ইসলাম নামে এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে ডিবির রমনা জোনাল টিম। পুলিশের দাবি, তার পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। পরে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, বাসে অগ্নিসংযোগ ও বোমাবাজির সমন্বয়ের অভিযোগে কক্সবাজার থেকে ডেমরা থানা মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সবুজকে গ্রেপ্তার করেছে ডেমরা থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে নাশকতার কর্মকাণ্ড সমন্বয়ের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ডিবি ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মো. শাহীন এবং ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নাশকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। তাদের দাবি, নজরদারি ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। নাশকতার সঙ্গে জড়িত মূল নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও তা ভেঙে দিতে ডিবির অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তারা।