সারাদেশ
সীমান্তে ত্রিমুখী সংঘর্ষে উত্তপ্ত নাইক্ষ্যংছড়ি, আতঙ্কে গ্রামবাসী
দীর্ঘদিন শান্ত থাকার পর আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকা। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় এপারের চাকঢালা, ঘুমধুম, দৌছড়ি, জামছড়ি ও সাপমারা ঝিরি এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত তিন দিন ধরে ৪৩ থেকে ৪৯ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের বিপরীতে দফায় দফায় প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। গতকাল রোববার সকালেও সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলোতে গুলির আওয়াজ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—গত শনিবার দুপুর ১টার দিকে সংঘর্ষ চলাকালে কয়েক রাউন্ড গুলি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে পড়ে। এর মধ্যে একটি গুলি চাকঢালা এলাকার কৃষক ছৈয়দ আলমের বাড়ির দেয়ালে আঘাত করে গর্ত সৃষ্টি করে। আরও কিছু গুলি বাড়ির উঠান ও ফসলি জমিতে পড়েছে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের কাছ থেকে দখলকৃত একটি আরাকান আর্মির ঘাঁটি পুনর্দখলে নিতে হামলা চালিয়েছে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)। শুক্রবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই যৌথ হামলা শনিবার সকাল থেকে আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
ঘুমধুম, দৌছড়ি, চাকঢালা, জামছড়ি, সাপমারা ঝিরির বিভিন্ন স্থানে গুলির শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের ত্রিমুখী হামলায় আরাকান আর্মির ঘাঁটি পুরান মাইজ্যা এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে উত্তপ্ত।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার রাত থেকে মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলির শব্দ অব্যাহত রয়েছে। চাকঢালার চেরারমাঠ গ্রামের ছৈয়দ আলমের স্ত্রী আলমাস খাতুন ও ছেলে ওসমান গণি বলেন, শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাদের বাড়ির উঠানে এবং ফসলি জমিতে গুলি এসে পড়ে। দেয়ালে আঘাত করে একটি গুলি গর্তের সৃষ্টি করে। পরে বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
জামছড়ির বাসিন্দা আবদুস সালাম, ছৈয়দ নূর ও গুরা মিয়া জানান, শনিবার সকাল ও দুপুরে তাঁরা দুই দফা গুলির প্রচণ্ড শব্দ শুনেছেন। তাঁদের ধারণা, সংঘর্ষ আরএসও ও আরাকান আর্মির মধ্যে হলেও এতে আরসারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
চাকঢালার সাবেক ইউপি সদস্য ফরিদ আলম বলেন, সম্প্রতি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প দখল নেয় বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি। এখন সেই ক্যাম্প পুনর্দখলে নিতে সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলো হামলা চালাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে ১১ বিজিবি ও ৩৪ বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তজুড়ে বিজিবি সদস্যদের কড়া অবস্থান লক্ষ্য করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। সীমান্তবর্তী গ্রামবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি জানান, সীমান্ত এলাকার মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে মাইকিং ও সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
সীমান্তজুড়ে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সীমান্তের স্থায়ী শান্তির জন্য পরিস্থিতি নিরসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও চাপ জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।