সারাদেশ
নোয়াখালীতে সাড়ে ৫ কোটি টাকার মালামাল ১৯ লাখে বিক্রি, ‘পলাতক’ নির্বাহী প্রকৌশলী
নোয়াখালীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের (ডিপিএইচই) একটি প্রকল্পের আওতায় সংরক্ষিত প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৯ লাখ টাকায় গোপনীয়ভাবে নিলামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সাধারণ ঠিকাদাররা। অভিযোগের পর একদিন ঠিকাদারদের হাতে অবরুদ্ধ থাকার পর পরদিন কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় তাকে ‘পলাতক’ বলে দাবি করা হচ্ছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নোয়াখালী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। ওই সময় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অফিসের বাইরে অবস্থান নেন। এর আগের দিন রবিবার (৪ জানুয়ারি) বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সাধারণ ঠিকাদাররা তাকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, ডানিডা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি গুদামে সংরক্ষিত ছিল। এসব মালামাল অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে নিলামে তোলা হয়। নামমাত্র একটি পত্রিকায় কথিত দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় অধিকাংশ ঠিকাদার বিষয়টি জানতে পারেননি এবং দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
এই সুযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেসার্স শাহনাজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার মালামাল মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর এ নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
সূত্র জানায়, নিলামে দেড় ইঞ্চি ব্যাসের ৪৮ হাজার ও তিন ইঞ্চি ব্যাসের ২৮ হাজার পাইপসহ প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার ফুট বিভিন্ন মাপের পাইপ বিক্রি করা হয়। নিলামের পর রাতারাতি এসব সামগ্রী গুদাম থেকে সরিয়ে চরবাটা ও চর আমান উল্লা এলাকায় মজুত করা হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা বিষয়টি জানতে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে গেলে তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। একপর্যায়ে ঠিকাদাররা সংঘবদ্ধ হয়ে তার কার্যালয়ে বিক্ষোভ করেন, স্লোগান দেন এবং তার অপসারণ ও শাস্তির দাবি জানান। পরে নিলাম বাতিলের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয়।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৯০ কোটি টাকা ফেরত চলে গেছে। এতে নোয়াখালীর বহু সুবিধাবঞ্চিত মানুষ উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আরও অভিযোগ, যেসব ঠিকাদার মোটা অঙ্কের কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের কাজের কার্যাদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে কমিশন দিয়ে কাজ পাওয়া ঠিকাদাররা নিম্নমানের ও দায়সারা কাজ করছেন, ফলে প্রকল্পের গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস এম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দুলাল বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে ঠিকাদারি করছি। এভাবে প্রকাশ্যে লুটপাট আগে কখনও দেখিনি। জুলাই আন্দোলনের পর ভেবেছিলাম অনিয়ম কমবে, কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কোনো নিলাম দিইনি। নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে। ঠিকাদারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিলাম কার্যাদেশ বাতিলের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমি পলাতক নই, অফিসের কাজেই সাইটে অবস্থান করছি।’