সারাদেশ
রংপুরে চার খুনের রহস্যে এবার সামনে এলো নতুন মোড়
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্যের অসংগতি রয়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। হত্যাকাণ্ডের সময়, রহস্যজনক ফোনকল, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ঘটনাস্থলের ফরেনসিক আলামত নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। এর আগে ২৪ ও ২৫ আগস্ট সংগঠনটির দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রংপুরে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে। তারা নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবার, থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, মর্গসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
আসকের প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তীর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রীতিলতার সঙ্গে তার স্বাভাবিকভাবে কথা হয়। এরপর রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে পূজার নম্বরে একটি কল আসে। তবে তিনি সেই কল ধরতে পারেননি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ রাতে অভিযুক্তরা বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ায়। পরে ভোরের দিকে পরিবারের চার সদস্যকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
এ অবস্থায় আসকের প্রশ্ন, রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে কলটি কে করেছিলেন এবং তখন ফোনটি কোথায় ছিল? পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোনগুলো কখন বন্ধ হয়ে যায়, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।
এ জন্য কলের বিস্তারিত রেকর্ড ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে আসক। একই সঙ্গে পুলিশের দেওয়া সময়রেখার সঙ্গে ওই রহস্যজনক ফোনকলের কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার কথা বলেছে সংগঠনটি।
পুলিশের দাবি, মাদক সেবনে বাধা দেওয়া এবং নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার উদ্দেশ্যে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর অভিযুক্তরা দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে খাবারও খেয়েছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে আসকের প্রশ্ন, অভিযুক্তরা যদি হত্যার পর দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করে থাকে, তাহলে আসবাব, রান্নাঘর, খাবারের পাত্র, বাথরুমসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, চুল ও ত্বকের কোষের মতো জৈবিক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে কি না। এসব আলামত সন্দেহভাজনদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে তারা।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের রাতে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনাও সন্দেহ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলা হলেও কখন, কীভাবে এবং কারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, তা প্রযুক্তিগতভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে আসক।
তথ্যানুসন্ধানের সময় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেন সংগঠনটির প্রতিনিধিরা। সিদ্ধার্থের বাবা আটকের সময় ছেলের পোশাক পরিবর্তনসহ ঘটনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অপর অভিযুক্ত সীমান্তের পরিবারের সদস্যরাও নিজেদের বক্তব্য ও সংশয়ের কথা জানান।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে না পারলেও মর্গের কর্মীদের কাছ থেকে তথ্য নেয় আসক। তারা মরদেহে পচনের লক্ষণ ও আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা জানালেও যৌন নির্যাতনের দৃশ্যমান কোনো আলামত দেখেননি বলে জানিয়েছেন।
তবে মর্গকর্মীদের চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখছে না আসক। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, আঘাতের ধরন এবং কোনো ধরনের নির্যাতন হয়েছিল কি না, তা ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষাগারভিত্তিক রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং বিভ্রান্তি এড়াতে সব ধরনের আলামত যাচাই করা হচ্ছে।
আসকের মতে, মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে অনুমানের ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি সূত্রের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত করতে হবে। রহস্যজনক ফোনকল, হত্যার প্রকৃত সময়, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের কারণ, ঘটনাস্থলের ফরেনসিক আলামত এবং ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন সবকিছু বিশ্লেষণের মাধ্যমেই চার খুনের প্রকৃত রহস্য বের করা সম্ভব বলে মনে করছে সংগঠনটি।