সারাদেশ
‘না খেয়ে মরব, তবুও ভিক্ষা করব না’ এক পা হারিয়েও ফুটপাতে কলা বিক্রি বাবুলের
মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে প্রতিদিন কলার পসরা সাজিয়ে বসেন বাবুল হোসেন। বয়স ৫০ বছর। এক পা নেই, শারীরিক উচ্চতাও চার ফুটের কিছুটা বেশি। তবু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা অভাব তাকে থামাতে পারেনি। এক পায়ে ভর করে প্রায় তিন দশক ধরে কলা বিক্রি করে সংসার চালিয়ে আসছেন তিনি।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ছোট ভাটবাউর গ্রামের বাসিন্দা বাবুল ছোটবেলায় স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও তা বেশি দূর এগোয়নি। এরপর বাবার সঙ্গে কলার ব্যবসায় যুক্ত হন। বাবার কাছ থেকেই এই কাজ শিখে ধীরে ধীরে নিজেই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
তবে ১৯৯৭ সালে হঠাৎ তার ডান পায়ে গুরুতর অসুস্থতা দেখা দেয়। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেননি তিনি। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েও কোনো উন্নতি হয়নি। একপর্যায়ে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় অস্ত্রোপচার করে তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়।
পা হারানোর পর কিছুদিন ঘরে বসে ছিলেন বাবুল। শারীরিক কষ্ট ও অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়লেও সংসারের প্রয়োজন তাকে আবার কাজে ফিরিয়ে আনে। এক পায়ে ভর করে বাবার সঙ্গে পুনরায় কলা বিক্রি শুরু করেন। সেই থেকে প্রায় ৩০ বছর ধরে একই পেশায় রয়েছেন তিনি।
বাবুল বলেন, এক পায়ে চলাফেরা করা অত্যন্ত কষ্টকর। প্রতিদিন নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা হলেও কাজ করে খেতে চান তিনি। ভিক্ষা করে জীবন চালানোর কথা কখনো ভাবেননি। তার ভাষায়, ‘না খেয়ে মরে যাব, তবুও ভিক্ষা করব না।’
বাবুলের সংসারে স্ত্রী, বাবা, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছেন। বড় মেয়ে দশম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে ভবিষ্যতে ভালো অবস্থানে দেখতে চান তিনি। তবে সীমিত আয়ে সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাকে।
জীবিকার এই লড়াইয়ে ফুটপাত নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয় বাবুলকে। মাঝে মাঝে পুলিশ এসে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। তখন কলা নিয়ে কোথায় বসবেন, তা নিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। অন্য কোথাও গিয়ে বসার সুযোগ না থাকায় বিক্রি করতে না পারলে কলা পচে নষ্ট হয়ে যায়।
বাবুল জানান, ফুটপাতের এক পাশে বসে কলা বিক্রি করাই তার একমাত্র আয়ের পথ। তাই সেখান থেকে উঠে যেতে হলে তিনি বড় সমস্যায় পড়েন। অন্য কোনো কাজও তার পক্ষে করা সম্ভব নয়।
দীর্ঘদিন ধরে বাবুলকে কাছ থেকে দেখেছেন পাশের কলা বিক্রেতা রুবেল হোসেন। তার মতে, বাবুলের ব্যবহার ভালো এবং ক্রেতাদের সঙ্গে লেনদেনও ভালো। শারীরিকভাবে এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না। এ কারণে তার দোকানে ক্রেতার সংখ্যাও বেশি।
পাশের পান ব্যবসায়ী আলম মিয়াও বাবুলের প্রশংসা করেন। তার মতে, সবসময় হাসিমুখে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন বাবুল। নিজের কষ্টের কথা কাউকে না বলে নীরবে কাজ করে যান। তার জন্য সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা হলে ভালো হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাবুল এখন ব্যবসাটা কিছুটা বড় করতে চান। এ জন্য সুদবিহীন এক লাখ টাকা ঋণ পেলে বেশি পরিমাণে কলা কিনে ব্যবসা বাড়াতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি। এতে আয় বাড়বে এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচসহ সংসারের ব্যয় মেটানো সহজ হবে।
এর পাশাপাশি একটি কৃত্রিম পা পাওয়ারও স্বপ্ন দেখেন বাবুল। কৃত্রিম পা পেলে চলাফেরার কষ্ট অনেকটাই কমবে বলে মনে করেন তিনি।
অভাব, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাবুলের লড়াই থেমে নেই। এক পায়ে ভর করেই প্রতিদিন ফুটপাতে বসছেন, কলা বিক্রি করছেন এবং পরিবারের জন্য উপার্জন করছেন। তার কাছে এই কাজ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকারও প্রতীক।