সারাদেশ

ফেনীতে সাত মাসেই ১০০ ট্রান্সফরমার চুরি, বিদ্যুৎহীন গ্রাহকদের ভোগান্তি


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম

ফেনীতে সাত মাসেই ১০০ ট্রান্সফরমার চুরি, বিদ্যুৎহীন গ্রাহকদের ভোগান্তি
ছবি: সংগৃহীত

ফেনীতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই জেলার পাঁচ উপজেলা ও পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে ১০০টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এ সংখ্যা গত ২০২৫ সালের পুরো বছরে চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একের পর এক চুরির ঘটনায় তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। পাশাপাশি চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমার প্রতিস্থাপনে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় মোট ১০০টি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে ফেনী সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ ৫৮টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এছাড়া ছাগলনাইয়ায় ৩৬টি, পরশুরামে ৩টি, সোনাগাজীতে ২টি এবং দাগনভূঞায় ১টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা মূল্যবান তামার কয়েল ও তারই চোরচক্রের মূল লক্ষ্য। সাধারণত রাতের আঁধারে নির্জন ও জনবসতি থেকে দূরে স্থাপন করা ট্রান্সফরমারগুলোকে টার্গেট করে চোরেরা। সুযোগ বুঝে ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যাওয়ার পর সেগুলোর ভেতর থেকে তামার কয়েল ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতব অংশ খুলে নেওয়া হয়। পরে অবশিষ্ট যন্ত্রাংশ ফেলে রেখে যায় তারা।

ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রাহকদের বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়। এতে বিশেষ করে গরমের মৌসুমে দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাসাবাড়ির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিকাজেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প, সেচব্যবস্থা ও দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, একটি ৫ কেভিএ ক্ষমতার ট্রান্সফরমারের দাম প্রায় ৫৩ হাজার টাকা। ১০ কেভিএ ট্রান্সফরমারের দাম প্রায় ৮৩ হাজার টাকা, ১৫ কেভিএ ট্রান্সফরমারের দাম প্রায় ১ লাখ টাকা এবং ২৫ কেভিএ ট্রান্সফরমারের দাম প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ফলে একের পর এক ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ায় বিদ্যুৎ বিভাগকে যেমন অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, তেমনি নীতিমালা অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে এর একটি অংশ গ্রাহকদেরও বহন করতে হচ্ছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ট্রান্সফরমার প্রথমবার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের জন্য গ্রাহকদের এর মূল্যের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করতে হয়। একই ট্রান্সফরমার দ্বিতীয়বার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমারের পুরো মূল্যই গ্রাহকদের বহন করতে হয়। ফলে কোনো এলাকায় একবার ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর একই স্থানে পুনরায় চুরির ঘটনা ঘটলে গ্রাহকদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও নির্জন এলাকায় স্থাপিত ট্রান্সফরমার নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন গ্রাহকেরা। তাদের অভিযোগ, চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন করতে সময় লাগায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থও গুনতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িত চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নির্জন এলাকায় থাকা ট্রান্সফরমারগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানো, স্থানীয়ভাবে পাহারার ব্যবস্থা করা এবং চুরি প্রতিরোধে বিদ্যুৎ বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম (প্রশাসন) আবদুল আউয়াল বলেন, প্রতিটি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। চুরি প্রতিরোধে গ্রাহকদেরও সচেতন করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে ট্রান্সফরমার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পাহারার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি ঠেকাতে স্থানীয়ভাবে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা কর্মকাণ্ড চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ অফিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর জন্য গ্রাহকদের অনুরোধ করা হয়েছে।

ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চুরি হওয়া তারও উদ্ধার করা হয়েছে। ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গরমের মৌসুমে ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা গ্রাহকদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই শুধু চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; চোরচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও নির্জন এলাকায় স্থাপিত ট্রান্সফরমারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে চুরি প্রতিরোধে বিদ্যুৎ বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।