সারাদেশ

রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশাকার এন. এন. সাহা, ৫৫ বছরেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি


নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৩ পিএম

রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশাকার এন. এন. সাহা, ৫৫ বছরেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশাকার এন. এন. সাহা, ৫৫ বছরেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

চুয়াডাঙ্গার কৃতী সন্তান এন. এন. সাহার নকশা করা রাষ্ট্রীয় মনোগ্রাম আজও বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ নথিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। সচিবালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আদালত, সরকারি সিলমোহর, বাংলাদেশ পাসপোর্টের প্রচ্ছদসহ রাষ্ট্রের নানা দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তার নকশা করা এই মনোগ্রাম। তবে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই কৃতী মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী ও সমাজসেবক পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা জাতীয় সম্মাননা।

এন. এন. সাহার মৃত্যুবার্ষিকী এলেই নতুন করে সামনে আসে তার অবদানের বিষয়টি। যে সৃষ্টি রাষ্ট্র প্রতিদিন ব্যবহার করছে, সেই সৃষ্টির কারিগর কেন এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত নন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকরা।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দক্ষিণ পশ্চিম রণাঙ্গনের প্রধান উপদেষ্টা ডা. আসহাব উল হকের আহ্বানে মুজিবনগর সরকারের জন্য রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের একাধিক নকশা তৈরি করেন এন. এন. সাহা। পরে তার তৈরি নকশাগুলোর মধ্য থেকে একটি নির্বাচিত হয় এবং ২ এপ্রিল তা সরবরাহ করা হয়।

পরবর্তীতে সেই নকশার ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে সরকারি মনোগ্রাম ব্যবহৃত হতে থাকে। ১০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হলেও পাকিস্তানি বাহিনীর বিমান হামলার কারণে অনুষ্ঠানটি বৈদ্যনাথতলায়, বর্তমান মুজিবনগরে, স্থানান্তর করা হয়।

রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামটিতে একটি বৃত্তের মাঝখানে হলুদ রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র রয়েছে। বৃত্তের ওপরের অংশে লেখা রয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এবং নিচের অংশে সরকার। দুই পাশে রয়েছে মোট চারটি তারকা। বর্তমানে সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম, সিলমোহর এবং বাংলাদেশ পাসপোর্টের প্রচ্ছদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই মনোগ্রাম ব্যবহৃত হচ্ছে।

শুধু রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশাকার হিসেবেই নয়, এন. এন. সাহা ছিলেন ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী ও সমাজসেবক। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদান এবং শিল্পচর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রগঠনে তার ভূমিকা স্থানীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। তবে তার এই অবদানের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন এখনো হয়নি বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।

চুয়াডাঙ্গাবাসীর কাছে বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তির সম্মানের সঙ্গে জড়িত নয়, জেলার গৌরবের সঙ্গেও জড়িত। তাদের দাবি, চুয়াডাঙ্গার এই সন্তান স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক নির্মাণে ভূমিকা রেখেছেন। অথচ জাতীয় পর্যায়ে তার নামে উল্লেখযোগ্য কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা নেই।

পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে তার অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, এটি কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহের বিষয় নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ। একজন শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা এবং রাষ্ট্রগঠনের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে এন. এন. সাহার যথাযথ মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের সঠিক ইতিহাস জানতেও সহায়তা করবে।

সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, স্বাধীনতার এত বছর পরও রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশাকার হিসেবে এন. এন. সাহার অবদান কেন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে না। তার জীবন ও কর্ম কেন জাতীয় পাঠ্যক্রম, জাদুঘর কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মাননার আলোচনায় যথাযথভাবে স্থান পাবে না।

২০০২ সালের ২ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন এন. এন. সাহা। পরে তার সহধর্মিণী বিমলা বালা সাহাও মারা যান। তাদের চার পুত্রের মধ্যে মেজো পুত্র মনোজ কুমার সাহাও বর্তমানে আর বেঁচে নেই।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, বর্তমানে তারা আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ যে মানুষের সৃষ্টি আজও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই মানুষের পরিবারই এখন নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, এন. এন. সাহাকে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা দেওয়া হলে তা শুধু তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনই হবে না, তার পরিবারের প্রতিও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের প্রকাশ ঘটবে।

চুয়াডাঙ্গাবাসীর প্রত্যাশা, রাষ্ট্রীয় মনোগ্রামের নকশাকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেলার কৃতী সন্তান এন. এন. সাহার অবদান সরকারি উদ্যোগে যাচাই করে তাকে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তার পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও প্রত্যাশা স্থানীয়দের।