সারাদেশ

দুই হাতের কবজি নেই, স্বপ্ন পূরণে পায়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে কলি 


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

দুই হাতের কবজি নেই, স্বপ্ন পূরণে পায়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে কলি 
ছবিঃ সংগৃহীত

জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি নেই। হাত ছোট ও বাঁকা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অন্য সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন তার জন্য সহজ নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শৈশব থেকেই দারিদ্র্য আর বাবাকে হারানোর বেদনা। কিন্তু কোনো বাধাই দমাতে পারেনি কলি রানীকে। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর স্বপ্ন পূরণের দৃঢ় প্রত্যয়ে পা দিয়ে লিখেই এবার উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সে।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শিক্ষার্থী কলি রানী ছোটবেলাতেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে বাবা মনোরঞ্জন রায় মারা যান। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট কলি। বাবার মৃত্যুর পর অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে উঠলেও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ কখনো কমেনি। বরং কারও সহযোগিতা ছাড়াই নিজের ডান পা দিয়ে লেখা শিখে একের পর এক শিক্ষাজীবনের ধাপ অতিক্রম করেছে।

শিক্ষাজীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছে কলি। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় পা দিয়ে লিখেই এ গ্রেড অর্জন করে। পরে এসএসসি পরীক্ষাতেও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়। শুধু লেখালেখিই নয়, পা দিয়েই দক্ষতার সঙ্গে কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারে সে। পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

শুধু পড়াশোনাতেই নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রয়েছে কলি রানীর সাফল্য। গান গাইতে ভালোবাসে সে এবং স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একাধিক পুরস্কারও অর্জন করেছে।

কলি রানীর বড় ভাই মন্টু রাম রায় জানান, জন্ম থেকেই তার বোনের হাতের আঙুল নেই, হাতও ছোট ও বাঁকা। তাই অন্যদের মতো হাতে কলম ধরে লেখা সম্ভব নয়। শুরুতে ডান পা দিয়ে ধীরে ধীরে লেখার অনুশীলন করলেও এখন সে বেশ দ্রুত লিখতে পারে। বোনের এই অদম্য মনোবল ও সংগ্রামী মানসিকতায় পরিবার গর্বিত বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন, যাতে কলি তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।

কলি রানী জানায়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তার স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। নিজের যোগ্যতায় পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের মানুষের সেবা করতে চায় সে। বাবার শূন্যতা ও সংসারের অভাব তাকে কষ্ট দিলেও সেই কষ্টই তার এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হয়ে উঠেছে।

কাউনিয়া মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য পরীক্ষার্থীর মতোই কলি রানী পা দিয়ে উত্তরপত্র লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কলির এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি সত্যিই অনুকরণীয় এবং উচ্চশিক্ষার পথচলায় তার সফলতা কামনা করেন।

কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলি রানীর পথচলাকে থামাতে পারেনি। তার সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য মনোবল অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা। উপজেলা প্রশাসন সবসময় তার পাশে থাকবে এবং সে যেন উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে, সেই প্রত্যাশাই সবার।