সারাদেশ
জামালপুরে চাঁদা না দিলে যমুনার চরেও গরু-মহিষ চরানো যায় না
জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার সীমান্তবর্তী যমুনার চরাঞ্চলে চাঁদা না দিলে কাশবন ও তৃণভূমিতে গরু-মহিষ চরাতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চরাঞ্চলের তৃণভূমির দখল ও আধিপত্য নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রকে নির্ধারিত হারে চাঁদা না দিলে বাথানমালিক ও রাখালদের ওপর জুলুম-নির্যাতন, গরু-মহিষ লুট এবং রাখাল অপহরণের মতো ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে প্রতিবছর হাজার হাজার গরু-মহিষ চরাতে নিয়ে যান মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, সারিয়াকান্দি ও আশপাশের এলাকার বাথানমালিকরা। এসব চরে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কাশবন ও প্রাকৃতিক তৃণভূমি গড়ে ওঠে। এই তৃণভূমির দখলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, তৃণভূমির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চক্রগুলো বাথানমালিকদের কাছ থেকে গরু-মহিষ চরানোর বিনিময়ে অর্থ আদায় করে।
সম্প্রতি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার পাকুরিয়া চরে কাশবনের দখলকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষের নেতা মুসলেম উদ্দীনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর যমুনার চরাঞ্চলে তৃণভূমি দখল, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মুসলেম উদ্দীনের মৃত্যুর পর তার পক্ষের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে, চরাঞ্চলের তৃণভূমি নিয়ন্ত্রণে আরেকটি প্রভাবশালী পক্ষ সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মুসলেম উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন পক্ষটি এলাকায় ‘আওয়ামী লীগের সিন্ডিকেট’ হিসেবে পরিচিত ছিল। মুসলেম উদ্দীন পাকুরিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন বলে তারা জানান। তার মৃত্যুর পর স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহজাহান ওই পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে দাবি করেন তারা।
অন্যদিকে, গিয়াস খান ও হায়দার খানের নেতৃত্বাধীন পক্ষটি এলাকায় ‘বিএনপির সিন্ডিকেট’ হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন। তারা মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঞ্জুর কাদের বাবুল খানের চাচাতো ভাই বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
মাদারগঞ্জের একাধিক গরু-মহিষের মালিক জানান, প্রতিবছর উপজেলার প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার গরু-মহিষ যমুনার চরাঞ্চলে চরাতে নেওয়া হয়। এসব বাথানে শত শত রাখাল অবস্থান করেন। চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত তৃণভূমি থাকায় দূর-দূরান্ত থেকেও বাথান নিয়ে সেখানে যান মালিকরা। কিন্তু গত কয়েক বছরে তৃণভূমির দখলকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
রবিন মিয়া নামে এক রাখাল বলেন, ‘এখানে বিঘাপ্রতি দেড় হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে আমরা মহিষ চরাই। টাকা না দিলে অপহরণ কিংবা মহিষ চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক রাখাল বলেন, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে তৃণভূমির দখলকে কেন্দ্র করে কয়েকটি চক্র বাথানমালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। তার অভিযোগ, নির্ধারিত অর্থ না দিলে রাখাল অপহরণ, গরু-মহিষ লুটসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
ওই রাখাল আরও বলেন, সম্প্রতি সারিয়াকান্দির কাজলা ইউনিয়নের চর ঘাঘুয়া এলাকা থেকে মাদারগঞ্জের কয়েকজন মহিষমালিকের বাথান থেকে চার রাখালকে অপহরণ করা হয়। পরে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে পাবনার রূপপুর এলাকা থেকে তাদের ছাড়িয়ে আনা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাথানমালিক বলেন, ‘আমার বাবা-দাদারাও এই নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে মহিষ চরাতেন। তখন কখনো চাঁদা দিতে হয়নি। কিন্তু গত দুই বছরে কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লোক নয়। এসব সিন্ডিকেটে বিভিন্ন দলের লোকজনই রয়েছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরাঞ্চলে তৃণভূমির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তার শুধু অর্থ আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর জেরে বিভিন্ন সময় বিরোধ, মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। ফলে একদিকে যেমন বাথানমালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন রাখালরাও।
এদিকে তৃণভূমি নিয়ে বিরোধ, সিন্ডিকেটের আধিপত্য ও চাঁদাবাজি বন্ধে সম্প্রতি কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম একটি বৈঠকের আয়োজন করেন। সেখানে চরাঞ্চলের পরিস্থিতি এবং বাথানমালিক ও রাখালদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বৈঠক করে কীভাবে এ সমস্যা সমাধান করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছি।’ তিনি দাবি করেন, বিএনপির কেউ এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত নন।
চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঞ্জুর কাদের বাবুল খান বলেন, ‘চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের সঙ্গে আমার চাচাতো ভাইয়েরা জড়িত নন। তাদের ফাঁসানো হয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউপি সদস্য শাহজাহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মাদারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় বলেন, ‘আমরাও এ ধরনের অভিযোগের কথা শুনেছি। তবে লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তারা নিজেরাই পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করে নেন।’
সারিয়াকান্দি থানার ওসি আ ফ ম আছাদুজ্জামান বলেন, মুসলেম উদ্দীন হত্যা মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত করছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। তবে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।’
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি ওসিকে বিশেষভাবে বলে রাখব। বিষয়টি দেখার জন্য।’
সারিয়াকান্দির ইউএনও এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। ওই চর এলাকার এ সমস্যা সম্পর্কে এখনো অবগত নই। তবে এ রকম কোনো সমস্যা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন ইউএনও। তার সঙ্গে কথা বলেন।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, যমুনার চরাঞ্চলের বিশাল তৃণভূমি বহু বছর ধরে গবাদিপশু পালনের জন্য ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তৃণভূমির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী বিভিন্ন পক্ষের তৎপরতা বাড়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং চরাঞ্চলে গবাদিপশু চরাতে আসা বাথানমালিক ও রাখালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ চান স্থানীয়রা।
সূত্র: ডেইলি স্টার