জাতীয়

ইউপি নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় বাড়ছে ২৪৩ শতাংশ


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম

ইউপি নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় বাড়ছে ২৪৩ শতাংশ
ছবি: সংগৃহীত

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে নির্বাচন পরিচালনা খাতে ব্যয় হয়েছিল ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এবার একই ৫৭টি খাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫১ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তাবিত এই ব্যয় অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়া গেলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে নির্বাচন পরিচালনা খাতের ব্যয় বাড়বে প্রায় ২৪৩ শতাংশ।

এর বাইরে ইউপি নির্বাচন উপলক্ষে ১২টি খাতে কোডভিত্তিক পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪৪ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে আসন্ন ইউপি নির্বাচনে মোট ব্যয় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। বিপুল এই অর্থের সংস্থান নিয়ে শিগগিরই ইসিসহ সংশ্লিষ্ট তিন বিভাগের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

ইসি সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।

৩,৯৮১ ইউপিতে ভোট এ বছর

দেশে বর্তমানে মোট ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হতে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হলে আগামী অক্টোবরের মধ্যেই তফসিল ঘোষণা করতে হবে ইসিকে।

এ কারণে ইউপি নির্বাচন আয়োজন নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ওপর নতুন করে প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে ইসি সূত্র বলছে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। তফসিল ঘোষণার আগে চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনাও রয়েছে কমিশনের। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ না হলে চলতি মাসেই তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও ইসি সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, নভেম্বরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে কমিশনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যেকোনো সময় তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।

পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসব নিয়ে চ্যালেঞ্জ

ইউপি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পাবলিক পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসবের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে। আগামী নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সাধারণত অধিকাংশ স্কুল-কলেজ ভবন ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও নির্বাচনী কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করা কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতবার সাত ধাপে হয়েছিল ইউপি নির্বাচন

২০২১ সালের ইউপি নির্বাচন মোট সাতটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথম ধাপে ৩৬৮টি, দ্বিতীয় ধাপে ৮৪০টি, তৃতীয় ধাপে ১ হাজার, চতুর্থ ধাপে ৮৩৭টি, পঞ্চম ধাপে ৭০৮টি, ষষ্ঠ ধাপে ২১৬টি এবং সপ্তম ধাপে ১৩৬টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ করা হয়।

এর বাইরে বিশেষ বা অষ্টম ধাপে আরও ৯টি ইউপির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সব মিলিয়ে ওই নির্বাচনে মোট ৪ হাজার ১১৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করতে নির্বাচন কমিশনের সময় লেগেছিল ১৯৬ দিন বা প্রায় ছয় মাস।

প্রথম ধাপে ১,২০০ ইউপিতে ভোটের পরিকল্পনা

এবার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্বাচনের ধাপ কম-বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। প্রথম ধাপে প্রায় ১ হাজার ২০০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এবার এক ধাপের সঙ্গে পরবর্তী ধাপের সময়ের ব্যবধান আগের তুলনায় বেশি রাখার চিন্তা করা হচ্ছে।

ইসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত নির্বাচনে এক ধাপ থেকে অন্য ধাপের ব্যবধান কম থাকায় মাঠপর্যায়ে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছিল। মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই ও আপিল নিষ্পত্তি, প্রতীক বরাদ্দ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এবং ব্যালট পেপার পরিবহন—সব কার্যক্রম একই সময়ে পরিচালনা করতে গিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল।

এমনকি এক এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অন্য এলাকায় স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রশাসনিক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এবার ধাপে ধাপে নির্বাচনের সময়সূচি নতুনভাবে নির্ধারণ করছে ইসি।

যেভাবে বাড়ছে নির্বাচন পরিচালনার খরচ

ইউপি নির্বাচন পরিচালনা খাতের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালের নির্বাচনে ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রের বেষ্টনী নির্মাণ, ভোটকক্ষ প্রস্তুত ও মেরামত, মার্কিং প্লেস বা গোপন কক্ষ তৈরি, অস্থায়ী কেন্দ্র এবং অতিরিক্ত ভোটকক্ষ নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ১৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

এবার এসব কাজে ব্যয় বাড়িয়ে ৪৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এই খাতেই আগের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে।

একইভাবে আড়াই হাজার রিটার্নিং কর্মকর্তার জন্য ২০২১ সালে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এবার কর্মকর্তাপ্রতি ৫০০ টাকা করে বাড়িয়ে মোট ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া ব্যালট পেপার মুদ্রণ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সরবরাহ, নির্বাচনী আচরণবিধি তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কোডভিত্তিক পরিচালন ব্যয় ৮৪৪ কোটি টাকা

ইসির প্রস্তাবিত কোডভিত্তিক ব্যয়ের হিসাবেও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যান্য মনিহারি খাতে ৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, সম্মাননা ভাতা ৪৪৬ কোটি ৯৪ লাখ, যাতায়াত ভাতা ৯৬ কোটি, আপ্যায়ন ব্যয় ৯৬ কোটি ৭৪ লাখ, প্রচার ও বিজ্ঞাপন ৭ কোটি, মুদ্রণ ও বাঁধাই ৫০ কোটি এবং যানবাহন ব্যবহারে ২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া দায়িত্ব পালনকালে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪ কোটি টাকা, অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি ১৭ কোটি ১৬ লাখ, পেট্রোল-ডিজেল ও লুব্রিকেন্ট বাবদ ৪৬ কোটি ৬০ লাখ, দৈনিক ভাতা ১ কোটি ৮২ লাখ এবং পরিবহন ব্যয় ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ১২টি খাতে কোডভিত্তিক পরিচালন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৮৪৪ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

আইন ও আচরণবিধি সংস্কারের কাজ শেষ পর্যায়ে

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইন ও আচরণবিধি সংস্কারের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে নির্বাচন কমিশন। গত মাসেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন এবং স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে এগুলো গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।

তবে স্থানীয় সরকার আইনের খসড়া প্রস্তাবনা চূড়ান্ত হলেও তা এখনো সরকারের কাছে পাঠানো হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসে তাদের মতামত নেওয়ার পর খসড়াটি সরকারের কাছে পাঠাতে চায় কমিশন।

এ কারণে কয়েকজন কমিশনার সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখের মধ্যে তফসিল ঘোষণার কথা বললেও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কমিশনের ভেতরেও এ নিয়ে মতপার্থক্যের কথা শোনা যাচ্ছে। ইসির একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, কমিশনারদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং তথ্য আদান-প্রদানে অস্পষ্টতার কারণে নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে।

চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুতের পথে

ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন।

ভোটার স্থানান্তরের আবেদন করার শেষ সময় ৭ সেপ্টেম্বর এবং এসব আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা ১০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। স্থানান্তরসংক্রান্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা মুদ্রণের জন্য পাঠানো হবে।

সব প্রস্তুতি শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজন এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা। একদিকে বাড়ছে নির্বাচন পরিচালনার ব্যয়, অন্যদিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, জনবল নিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সময়সূচির সমন্বয়—সব মিলিয়ে এবারের ইউপি নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।