জাতীয়
জমির নামজারিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন নিয়ম, যা জানা জরুরি
জমি কেনা কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর শুধু দলিল নিবন্ধন করলেই মালিকানার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় না। সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নামজারি বা মিউটেশন করাও জরুরি। নামজারি হলো সরকারি খতিয়ানে আগের মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া।
সম্প্রতি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি নিয়ে নিয়মে পরিবর্তন এনেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি ভাগ-বাটোয়ারা না হলে আলাদা খতিয়ান করা যাবে না। সেক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে আলাদা করে বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন হবে না। তবে ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নিয়ে আলাদা আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে।
নামজারি কেন গুরুত্বপূর্ণ
জমি কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত না করলে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অন্য কেউ জমির ওপর দাবি করতে পারে কিংবা অবৈধ দখলের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ এবং জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও নিজের নামে খতিয়ান থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে নামজারির আবেদন করা যায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পর সাধারণত ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
উত্তরাধিকারী জমিতে নতুন নিয়ম কী
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা প্রজ্ঞাপনের পরিবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার পাঁচজন ওয়ারিশ থাকলে একজন ওয়ারিশ এককভাবে নিজের নামে পুরো জমির আলাদা নামজারি করতে পারবেন না। সব ওয়ারিশের নাম যৌথভাবে খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যাও উল্লেখ থাকবে।
এ ক্ষেত্রে আবেদনের সঙ্গে সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে আবেদন করা হলে তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং আবেদন নামঞ্জুরও হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, আগে অনেক ক্ষেত্রে এক বা দুইজন ওয়ারিশ অন্যদের বাদ দিয়ে জমি নিজের নামে নামজারি করে নিতেন। নতুন নিয়মে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকায় এমন সুযোগ কমবে।
বণ্টননামা না থাকলে কী হবে
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি ভাগ না হলে যৌথ নামজারির জন্য বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক নয়। শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করা যাবে না।
তবে ওয়ারিশরা যদি জমি ভাগ করে নিয়ে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হবে।
সহজভাবে বললে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে এখন দুটি ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথমটি হলো, সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করে একই খতিয়ানে মালিকানা অন্তর্ভুক্ত করা। দ্বিতীয়টি হলো, নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করা।
নামজারি ছাড়া জমি হস্তান্তরে বাধা
নতুন নিয়মে নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া জমি কেনাবেচা, দান কিংবা হেবা করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। দলিল নিবন্ধনের সময় সংশ্লিষ্ট খতিয়ান দেখানোর প্রয়োজন হতে পারে।
তবে যাদের আগে থেকেই নামজারি সম্পন্ন হয়েছে এবং সরকারি রেকর্ডে নাম সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তাদের নতুন করে নামজারি করার প্রয়োজন নেই। পুরোনো রেকর্ড ডিজিটাল ব্যবস্থায় সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে কি না, সেটিও অনলাইনে যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন নিয়মে সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোনো একজন ওয়ারিশের পক্ষে অন্য ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে জমি নিজের নামে নেওয়ার সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকদের তথ্য হালনাগাদ হবে এবং জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা কমতে পারে।
বিশেষ করে নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষায় এই নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। কারণ, সব ওয়ারিশের নাম খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হওয়ায় কোনো নারী ওয়ারিশকে বাদ দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমবে।
তবে মাঠপর্যায়ে কিছু সমস্যাও দেখা দিতে পারে। পরিবারের কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে, যোগাযোগের বাইরে থাকলে কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে সমস্যা হলে যৌথ নামজারির প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে। আবার আলাদা খতিয়ান করতে হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হবে, যার জন্য অতিরিক্ত সময় ও খরচ প্রয়োজন হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন করতে ভূমি অফিসগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নামজারির ক্ষেত্রে পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জমি কেনার পর দ্রুত নামজারির আবেদন করা উচিত। জমি কেনার ক্ষেত্রে দলিল নিবন্ধনের ৯০ দিনের মধ্যে নামজারির আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে পরিবারের সব ওয়ারিশের সঙ্গে আলোচনা করে যৌথ নামজারি করা যেতে পারে। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করা সম্ভব।