সারাবিশ্ব
একাই নদী পরিষ্কার করে তাক লাগালেন ২১ বছরের তরুণ
দূষণ ও আবর্জনায় দীর্ঘদিন ধরে জর্জরিত একটি নদী পরিষ্কারের উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন ভারতের ২১ বছর বয়সী তরুণ সুরেন্দ্র সিং চৌধুরী। সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষা না করে নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে নদী পরিষ্কারে নেমে পড়েন তিনি। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবার নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। পরিবেশ রক্ষায় তরুণটির কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ‘দ্য ওশান ক্লিনআপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বোয়ান স্লাট তাকে নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
‘বিট্টু তাবাহি’ নামে পরিচিত সুরেন্দ্র ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার বাসিন্দা। তার বাড়ির কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া আজনার নদী দীর্ঘদিন ধরে প্লাস্টিক, পচা আবর্জনা, কাদা, শেওলা ও নানা ধরনের বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছিল। নদীর তীরে থাকা একটি স্থানীয় মন্দিরের আশপাশের পরিবেশও ছিল অত্যন্ত নোংরা। নদীর পানি ও আশপাশের পরিবেশ থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে ভোগান্তিতে পড়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিস্থিতি দেখে আর অপেক্ষা করতে পারেননি সুরেন্দ্র। সরকারি কোনো উদ্যোগ বা সহায়তার অপেক্ষা না করে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে আজনার নদী পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথমদিকে কয়েকজন বন্ধু তাকে সহযোগিতা করলেও সময়ের সঙ্গে সেই সহযোগিতা কমে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রায় একাই নদী পরিষ্কারের কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চালিয়ে যেতে হয় তাকে।
সাধারণ কিছু সরঞ্জাম ব্যবহার করে নদীতে নেমে হাতে হাতে আবর্জনা অপসারণ শুরু করেন সুরেন্দ্র। দিনের পর দিন তিনি নদী থেকে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, কাদা, শেওলা ও অন্যান্য বর্জ্য তুলে ফেলেন। নদী পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনতেও নিজের জমানো অর্থ খরচ করেন এই তরুণ। কোনো বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থার সহায়তা ছাড়াই নিজের উদ্যোগে এভাবে একটি দূষিত নদী পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাওয়া স্থানীয়দেরও বিস্মিত করে।
তার উদ্যোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো—সুরেন্দ্র সাঁতারই জানতেন না। এরপরও পরিবেশ রক্ষার সংকল্প থেকে তিনি নদীতে নেমে কাজ চালিয়ে যান। ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও দূষিত নদীটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা থেকে সরে আসেননি তিনি।
নদী পরিষ্কারের এই কাজ অবশ্য মোটেও সহজ ছিল না। দূষিত পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে সংক্রমণ দেখা দেয় এবং ত্বকে চুলকানির সমস্যায় ভুগতে হয় তাকে। শুধু তাই নয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করার সময় কয়েকবার সাপের মুখোমুখিও হয়েছেন তিনি। তারপরও এসব ঝুঁকি ও শারীরিক সমস্যাকে উপেক্ষা করে নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন সুরেন্দ্র।
আজনার নদী পরিষ্কারের বিভিন্ন মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার পর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তার কাজের খবর পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ‘দ্য ওশান ক্লিনআপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বোয়ান স্লাটের কাছে। নদী পরিষ্কারে এক তরুণের এমন ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও নিষ্ঠার বিষয়টি তার নজর কাড়ে।
সুরেন্দ্রের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে বোয়ান স্লাট তাকে তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি পরিবেশ সংস্থার প্রধানের কাছ থেকে এমন প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি সুরেন্দ্রের জন্য যেমন বড় স্বীকৃতি, তেমনি তার স্থানীয় উদ্যোগও পেয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি।
সুরেন্দ্রের পারিবারিক ও শিক্ষাজীবনও বেশ সাধারণ। তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করেন এবং বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় এমন একটি বড় উদ্যোগ নেওয়া তার বয়সী অন্য তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
একটি দূষিত নদী পরিষ্কারের উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয়েছিল তার পথচলা। সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে সুরেন্দ্র দেখিয়েছেন, পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষা করতে হয় না-একজন মানুষের দৃঢ় সংকল্পও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।