সারাদেশ

গোপালগঞ্জে বিদ্যুৎ সংকট চরমে, হামলার শঙ্কায় অফিসে পুলিশি নিরাপত্তা


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

গোপালগঞ্জে বিদ্যুৎ সংকট চরমে, হামলার শঙ্কায় অফিসে পুলিশি নিরাপত্তা
ছবি: সংগৃহীত

গোপালগঞ্জে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় পৌর এলাকায় এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন গ্রাহকেরা। জনরোষে বিদ্যুৎ অফিস ও সঞ্চালনকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কায় গোপালগঞ্জ ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) কার্যালয় ও বিদ্যুৎ সঞ্চালনকেন্দ্রে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে বিদ্যুৎ অফিস ও সঞ্চালনকেন্দ্রে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ওজোপাডিকো সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জ পৌর এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকসংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এসব গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দিনে ১২ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। পাশাপাশি বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মিলন সরকার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজ, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। তার ওপর ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে ব্যবসায়িকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠান মালিক মুরসালিন ভূঁইয়া বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কাজই বিদ্যুৎনির্ভর। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক সময় কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, এতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

শিক্ষিকা লাবনী অধিকারী বলেন, তীব্র গরমের মধ্যে এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাসায় শিশু ও বয়স্ক মানুষ রয়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকলে তাঁদের নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৬০ বছরের বেশি বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা জমির হোসেন বলেন, ‘দিনে কতবার বিদ্যুৎ যায়, তার কোনো হিসাব নেই। কোনো কাজই ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুধু দৈনন্দিন জীবনযাত্রাই নয়, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ছোট-বড় শিল্প ও বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। ফলে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এদিকে, লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের একাংশ বিদ্যুৎ অফিসে হামলা করতে পারেন- এমন আশঙ্কা করছে ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ অফিস ও সঞ্চালনকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রকৌশলী।

গোপালগঞ্জ ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। গড়ে চাহিদার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো গেলে পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।

নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক সময় সাধারণ গ্রাহকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। সেই ক্ষোভ থেকে বিদ্যুৎ অফিসে হামলার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে- এমন আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে অফিস ও সঞ্চালনকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে গোপালগঞ্জের মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু নিরাপত্তা জোরদার নয়, সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।