সারাদেশ

আবেদন ও শুনানি ছাড়াই আসামির হাতে জামিনের আদেশ


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

আবেদন ও শুনানি ছাড়াই আসামির হাতে জামিনের আদেশ
ছবি: সংগৃহীত

গাইবান্ধায় আদালতে কোনো শুনানি বা জামিনের আবেদন ছাড়াই নারী নির্যাতন মামলার এক আসামির হাতে ‘জামিনের রিকল’ তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে থানায় ওই রিকল জমা দিতে গিয়ে সেটি ভুয়া বলে জানতে পারেন ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় আদালতের বেঞ্চ সহকারী ও মুহুরির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর গাইবান্ধার আদালত অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলার আসামি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা এলাকার শাহ আলম বুদার ছেলে জান্নাতুল ইসলাম। সম্প্রতি জামিনের বিষয়ে আদালতের মুহুরি শাহীন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। পরে শাহীন মিয়া তাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসানের কাছে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এ সময় মামলা নিষ্পত্তি ও জামিনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে তিনি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। তবে জান্নাতুল ইসলাম আদালতে নিজে কোনো জামিনের আবেদন করেননি এবং এ বিষয়ে কোনো শুনানিতেও অংশ নেননি বলে জানা গেছে।

এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর মুহুরি শাহীন মিয়া ও বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসান তার হাতে স্বাক্ষর করা একটি ‘জামিনের রিকল’ তুলে দেন বলে অভিযোগ করেন জান্নাতুল ইসলাম। ওই রিকল নিয়ে তিনি থানায় গেলে সেখানে সেটি ভুয়া বলে জানানো হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর আদালতপাড়ায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

ভুক্তভোগী জান্নাতুল ইসলাম বলেন, “আদালত থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হয়, আমার জামিন হয়ে গেছে। পরে থানায় রিকল জমা দিতে গেলে জানতে পারি, সেটি ভুয়া।” তার দাবি, জামিন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ভুয়া কাগজ দেওয়া হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে ওই দিন আদালতের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়নি এবং কোনো মামলারই শুনানি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ওই দিন কোনো মামলায় জামিনের আদেশ হওয়ার সুযোগ ছিল কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসান। তিনি বলেন, “রিকল আমি দিইনি। তারা নিজেরাই রিকলটি ভুয়া তৈরি করে থানায় দাখিল করেছে।” এ ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করবেন বলেও জানান।

অন্যদিকে মুহুরি শাহীন মিয়া বলেন, “আমি দরখাস্ত ২২ তারিখেই দিয়েছি। রিকল কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে আমি জানি না।” তার বক্তব্যের সঙ্গে ভুক্তভোগীর অভিযোগের পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর গত ২২ সেপ্টেম্বর মুহুরি শাহীন মিয়া একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতে ওই আসামির জামিনের আবেদন করেন। এতে ভুয়া জামিনের রিকল কীভাবে তৈরি হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত-তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন গাইবান্ধা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবু বকর সিদ্দিক ছানা। তিনি বলেন, ঘটনার সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের ঘটনা শুধু আদালতের নয়, পুরো কোর্ট অঙ্গন এবং গাইবান্ধা জেলার জন্যও সম্মানহানিকর। ভুয়া রিকল তৈরির সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

এ ঘটনায় ভুয়া জামিনের রিকল তৈরির পেছনে কারা জড়িত, কীভাবে আদালতের স্বাক্ষরযুক্ত নথির আদলে এমন কাগজ তৈরি করা হলো এবং টাকা লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু-এসব বিষয় এখন তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।