ক্যাম্পাস
আবাসন-নিরাপত্তা সংকটে কুবিতে কমছে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ
একসময়ের প্রতিবন্ধকতা পার করে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় বাড়ছে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। সময়ের সঙ্গে বদলেছে পুরোনো চিত্র, অনেক ক্ষেত্রেই ছেলেদেরকে পেছনে ফেলছে নারীদের অংশগ্রহণ। তবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানে রয়েছে ঠিক উল্টো মোড়। এখানে ছেলেদের সংখ্যায় ঢের পিছিয়ে মেয়েরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে এখানে পিছিয়ে রয়েছেন মেয়েরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের একাডেমিক শাখা হতে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) সর্বশেষ পাঁচটি শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা পাঁচ হাজার ২০৩ জন। যেখানে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই হাজার ৫০৮ জন এবং পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই হাজার ৬৯৫ জন। অর্থাৎ নারী শিক্ষার্থীর তুলনায় পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮৭ জন বেশি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ এই পাঁচটি শিক্ষাবর্ষের মধ্যে কেবল ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ছেলেরদের তুলনায় সংখ্যায় এগিয়ে মেয়েরা। বাদবাকি সবগুলো শিক্ষাবর্ষেই এগিয়ে রয়েছে ছেলেরা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ৪৬ জন যার মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৫০০ জন এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫৪৬ জন, ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষের মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ২৯ জন, যার মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৬৪ জন, পুরুষ শিক্ষার্থী ৫৬৫ জন৷ এছাড়া, ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষে মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ৩৮ জন, যার মধ্যে পুরুষ শিক্ষার্থী ৫২৬ জন এবং নারী শিক্ষার্থী ৫১২ জন। ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষে মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ৪৬ জন, যার মধ্যে পুরুষ শিক্ষার্থী ৫৪৩ এবং নারী শিক্ষার্থী ৫০৩ জন।
২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ৪৪ জন যার মধ্যে পুরুষ শিক্ষার্থী ৫১৫ জন এবং নারী শিক্ষার্থী ৫২৯ জন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ না হওয়ায়, এই শিক্ষাবর্ষের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
এদিকে শতকরার হিসেবে ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষে ৫২ দশমিক ২ শতাংশ ছাত্র এবং ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ ছাত্রী, ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষে ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ ছাত্র এবং ছাত্রী ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ছাত্রী ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ছাত্রী ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ। এবং যথারীতি ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে ছাত্রী ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ ছাত্রী।
এখানে দেখা যায়, ছেলে-মেয়ের সংখ্যার সর্বোচ্চ ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে, যেখানে ছেলে সংখ্যা এগিয়ে ১০১ জন নিয়ে। অন্যদিকে সর্বনিম্ন রয়েছে দুটি শিক্ষাবর্ষে। এরমধ্যে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ১৪ জন ছেলে এগিয়ে এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১৪ জন মেয়ে এগিয়ে। এছাড়া ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে সংখ্যায় ছেলে এগিয়ে ৪৬ জন এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এগিয়ে ৪০ জন। এখানে ছেলে সংখ্যার দৌরাত্ম্য ভেঙে মেয়ের সংখ্যা এগিয়ে গিয়েছে কেবল ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে। এখানে মেয়ের সংখ্যা বেশি ১৪ জন। ফলে স্রোতের বিপরীতে এটি আশা দেখাচ্ছে মেয়েদের।
এতসব শতাংশের হিসাবের বাহিরেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা থেকে শুরু আবাসন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আর এসব পিছিয়ে থাকা প্রভাব ফেলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তির ক্ষেত্রে।
এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে জানা যায়, অনেক পরিবার নিরাপত্তা, দূরত্ব ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মেয়েদের দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী হয় না। এর মধ্যে মেয়েদের আবাসিক হল ও আবাসন সুবিধার সীমাবদ্ধতা, নিরাপদ পরিবহন ও ক্যাম্পাস পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ পরিবারগুলোকে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে ধারণা তাদের।
এ ব্যাপারে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাফিসা রাদিয়া ঈশিতা বলেন, 'পরিবার এখনো তাদের মেয়েদের দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দিতে চাই না, বিশ্ববিদ্যালয় দূরে হলে মেয়েদের যাতায়াত সমস্যায় বেশি ভুগতে হয়। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকটের ফলে হল গুলোতে সহজে সিট পাওয়া যায় না এবং নিরাপত্তা জনিত সমস্যার কারণেও অন্যান্য জেলার নারী শিক্ষার্থীরা এখানে কম ভর্তি হয়।'
লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহিনা আক্তার বলেন, 'বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট প্রান্তে(দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল) বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান হওয়ায় দূরাঞ্চলের(উত্তরাঞ্চলের) নারী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে আগ্রহী হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রীদের জন্য হলের আসনসংখ্যা সীমিত আছে। নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত আবাসনের অভাবে অনেক ছাত্রী অন্য বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিতে উৎসাহিত হচ্ছে। এমনকি ২য়, ৩য় বর্ষে পড়ুয়া নারী শিক্ষার্থীও আবাসিক সুবিধা পাচ্ছে না।'
শিক্ষার্থীরা আরো জানায়, মেয়েদের সংখ্যা কম হওয়ার পেছনে একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক কারণও থাকতে পারে। নারী-বান্ধব সমাজ, সুযোগ-সুবিধা ও সহায়ক পরিবেশের ঘাটতি এখানে ভর্তিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে মেয়েদের।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিমা সুলতানা রাতুয়া বলেন, 'কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে শহরমুখী হতে হয়, তবে এই রাস্তা সেফ না হওয়ার কারণে নারী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। পাশাপাশি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র দুটি হল রয়েছে, যেখানে সিট সংখ্যাও কম। সিট পেলেও দীর্ঘ দিন পর্যন্ত এক সিটে দুইজন থাকতে হয়। আমার মনে হয় এসব কারণে নারী শিক্ষার্থী কম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে।'
এদিকে মেয়েরা কম ভর্তি হওয়ার পেছনে পরিবার কর্তৃক ছেলে সন্তানকে পড়ানোর প্রবণতা, অল্প বয়সে বিয়ে এবং ঝরে পড়ার মতো বিষয়গুলোও নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে বলে ধারণা দায়িত্বশীলদের।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক ও সহকারী প্রক্টর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, 'বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলে বাল্যবিবাহের একটা ব্যাপার আছে, যার কারণে মেয়ে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে। পরিবারের ছেলে সন্তানকে যেভাবে পড়াশোনা করানো হয় বা উচ্চশিক্ষার জন্য দূরে পাঠানো হয়, মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে তা কম দেখা যায়। যার কারণে পরিবার থেকে মেয়ে সন্তানদের জেলা শহরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ভর্তি করানো হয়। এসব কারণেই আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষার্থী কম। সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক অনেক সমস্যা এতে প্রভাব ফেলে।'
রক্ষণশীল পারিবারিক চিন্তাভাবনা, নিরাপত্তাহীনতা বোধের পাশাপাশি মাঝারি সারির বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াকেও কারণ হিসেবে দেখছেন এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ড. নাহিদা বেগম। তিনি জানান, 'আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো মেয়েদের বাইরে পড়তে দেওয়ার ব্যাপারে পরিবারগুলো এতটা প্রোগ্রেসিভ হতে পারেনি। এখানে একটা বৈষম্য দেখা যায়। অনেক পরিবার দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চেয়ে জেলা বা বিভাগীয় শহরের কলেজগুলোকে ভালো মনে করে।
তিনি আরো জানান, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ পেলে পরিবার থেকে সেখানে দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আমার কাছে ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়, যদি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান আরো উন্নত হয় বা আমরাও যদি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারি, তাহলে হয়ত নারী শিক্ষার্থীরা এখানে আরো বেশি ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করবে।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মাসুদা কামাল কণ্ঠেও একই সুর। তিনি জানান, 'বাংলাদেশের অনেক পরিবারই চায় তাদের মেয়ে সন্তান কাছাকাছি থাকুক, সেজন্য তারা জেলা বা বিভাগীয় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রেফার করে। আর এখন এটা আরো সহজলভ্য হয়েছে। পরিবার মেয়ে সন্তানকে নিয়ে সবসময়ই চিন্তিত থাকে, তাই দূরে পাঠায় না সেজন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দূরে হওয়ায় হয়ত নারী শিক্ষার্থী কম। তবে আমার ধারণা, আগামীতে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।'