ক্যাম্পাস

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব স্থাপত্য দিবস উদযাপন


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১১ পিএম

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব স্থাপত্য দিবস উদযাপন
ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

বিশ্ব স্থাপত্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের স্থাপত্য বিভাগের উদ্যোগে আলোচনা ও বক্তৃতা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্থাপত্য, পরিবেশ, নগরায়ণ, মানুষের আবাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন দেশবরেণ্য স্থপতি, শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এবারের বিশ্ব স্থাপত্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল-‘আবাসন মানুষের অধিকার: এটি নির্মাণ করি’।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরিফ নাফে আস-সাবের। মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন প্রখ্যাত স্থপতি, শিক্ষাবিদ এবং ‘শতোত্তো-সবুজ জীবনযাপনের জন্য স্থাপত্য’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি অধ্যাপক মো. রফিক আজম। এ ছাড়া বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আবদুল মতিন এবং প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বি.সি. বসাক। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক সোনিয়া আফরিন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরিফ নাফে আস-সাবের বিশ্ব স্থাপত্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তিনি উন্নত মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক গঠনে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি স্থাপত্যের সঙ্গে প্রকৃতির গভীর সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির মাঝেই আমরা আমাদের প্রাণ খুঁজে পাব। পৃথিবীকে বাঁচাতে তাই প্রকৃতিকে স্থাপত্যের মধ্যে নিয়ে আসার সময় হয়েছে।’

 

Stamford-2.jpg
ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

মূল বক্তব্যে অধ্যাপক মো. রফিক আজম স্থাপত্যকে কেবল ভবন নির্মাণের কারিগরি বিষয় হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও স্থানীয় জীবনযাপনের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি স্থাপনা শুধু ইট, বালু, সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর সমন্বয়ে তৈরি কোনো কাঠামো নয়; বরং মানুষের জীবনযাপন, সামাজিকতা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশের নদী, বন্যা এবং পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে অধ্যাপক রফিক আজম প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে তার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় নিয়ে স্থাপত্য এবং নগর পরিকল্পনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মানুষের আনন্দ, সামাজিক যোগাযোগ, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ভালোভাবে বেঁচে থাকার বিষয়গুলোও স্থাপত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা, স্থাপত্যচর্চা, নগরভাবনা এবং বাংলাদেশের স্থাপত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেওয়া বক্তব্য উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।

অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে শিক্ষার্থীরা স্থাপত্য ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। দেশীয় গাছের ব্যবহার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বন্যা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ এবং নির্মাণসামগ্রীর পরিবেশগত প্রভাবসহ নানা বিষয় উঠে আসে আলোচনায়।

শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক রফিক আজম বলেন, স্থাপত্যের অনেক সমস্যার সহজ বা একক কোনো সমাধান নেই। কোনো নির্মাণসামগ্রী কোথায়, কেন এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বড় ধরনের পরিবেশগত ও নগর সমস্যার সমাধানে গবেষণা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন জ্ঞানক্ষেত্রের সমন্বয়ের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

আলোচনায় বাংলাদেশের তরুণ স্থপতিদের দেশের নিজস্ব স্থাপত্য ঐতিহ্য, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও বাস্তবতাকে ভিত্তি করে বিশ্বপরিসরে নতুন চিন্তা ও সৃজনশীলতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করে টেকসই ও মানবিক স্থাপত্যচর্চার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল স্থপতি মো. রফিক আজমের রচিত ‘রফিক আজম: জীবন, স্থাপত্য ও নগর’ গ্রন্থটি স্থাপত্য বিভাগকে উপহার প্রদান। এ সময় বইটির মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘদিনের স্থাপত্যচর্চা, নগরভাবনা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে আরও সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির এবং বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব প্রকৌশলী শামসুল আলম। এ ছাড়া স্থাপত্য বিভাগের বিপুলসংখ্যক প্রাক্তন শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থাপত্য ও নির্মাণ পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।

অনুষ্ঠান আয়োজন ও সার্বিক সমন্বয়ের জন্য সহযোগী অধ্যাপক সানিয়া তাবাসসুম ও সহকারী অধ্যাপক ফারিয়া শারমিনকে ধন্যবাদ জানানো হয়। প্রাণবন্ত উপস্থাপনার জন্য জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সোনিয়া শারমিনের প্রশংসা করা হয়। পাশাপাশি স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক সোনিয়া আফরিনের সার্বিক সহযোগিতা এবং সহকারী অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের উপস্থিতিও অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সহযোগী অধ্যাপক সারাহ বাশনীন সুচনা।

বিশ্ব স্থাপত্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের স্থাপত্য বিভাগ মানবিক মূল্যবোধ, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং টেকসই স্থাপত্যচর্চার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে মানুষের আবাসনকে অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে প্রকৃতি, পরিবেশ ও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাপত্যচর্চার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার বার্তাও উঠে এসেছে অনুষ্ঠানে।