ফিচার
ই-ওয়েস্টের অন্ধকার ছায়ায় বাংলাদেশ
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন থেকে শুরু করে রেফ্রিজারেটর আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এই যন্ত্রগুলো এখন অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কিন্তু যখন এগুলোর ব্যবহার ফুরিয়ে যায়, তখন কী হয়? সেগুলোর পরিণতি নিয়ে আমরা কতটুক চিন্তিত? প্রযুক্তির এই অন্ধ দৌড়ে পেছনে পড়ে থাকা পুরনো যন্ত্রপাতিই তৈরি করছে এক নতুন সংকট যা হলো ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক বর্জ্য বা ই-ওয়েস্ট।
বাংলাদেশে দ্রুতই বাড়ছে এই অদৃশ্য বর্জ্যের পরিমাণ, যা একদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের শরীরে ফেলছে ভয়াবহ প্রভাব। প্রযুক্তির আশীর্বাদকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই দরকার সচেতনতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা।
পরিমাণ, প্রবণতা ও পরিস্থিতি
বাংলাদেশে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে অভাবনীয়ভাবে। ডিজিটাল যুগে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নতুন গ্যাজেট কিনছে, পুরনোগুলো বাতিল করছে। এর ফলে ই-ওয়েস্টের পরিমাণও দিন দিন বেড়ে চলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে উৎপন্ন ই-ওয়েস্টের মাত্র প্রায় তিন শতাংশ পুনঃচক্রায়িত হচ্ছে। সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি থাকলেও ই-ওয়েস্টের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে বলে অনুমান করা হয়। এটি কেবল একটি “অদৃশ্য” সমস্যা নয় বরং দ্রুত গতিতে বেড়ে ওঠা এক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সংকট।

বাড়ছে কেন ই-ওয়েস্ট
প্রযুক্তির জীবনকাল এখন অনেক কম। নতুন মডেল এলেই পুরনো যন্ত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার মানুষের মধ্যে নতুন পণ্য কেনার আগ্রহও বাড়িয়েছে। পাশাপাশি রি-ফার্বিশড বা দ্বিতীয়হাতে বিক্রির চক্রও পুরনো পণ্যকে দ্রুত বর্জ্যে পরিণত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংগঠিত রিসাইক্লিং ব্যবস্থার অভাব ও দুর্বল নীতিমালা। ফলে একদিকে গ্যাজেটের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে সমস্যা দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।
পরিমাপ ও সমস্যার বিস্তার
ই-ওয়েস্ট কেবল পুরনো টেলিভিশন বা কম্পিউটার নয়; এর মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ।যেমন:মোবাইল ফোন, প্রিন্টার, ব্যাটারি, এমনকি ছোট গৃহস্থালি যন্ত্রও। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়, এসব যন্ত্রের অচল অবস্থায় পড়ে থাকা বা ভুলভাবে ফেলে দেওয়া এখন সাধারণ চিত্র। এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে উৎপন্ন ই-ওয়েস্টের মাত্র তিন শতাংশ পুনর্ব্যবহার হয়, আর রিসাইক্লিং-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ পর্যাপ্ত সচেতন। বাকি অংশ প্রতিদিনই বিষাক্ত ঝুঁকির মুখে কাজ করছে। এই সংখ্যাগুলো প্রমাণ করে, ই-ওয়েস্ট এখন আর আড়ালের সমস্যা নয় এটি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছে।
পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের প্রভাব
ই-ওয়েস্টে থাকে লিড, ক্যাডমিয়াম, পারদ, আর্সেনিকসহ নানা ভারী ধাতু ও বিষাক্ত রাসায়নিক। এসব উপাদান সঠিকভাবে নিষ্পত্তি না হলে মাটির সঙ্গে মিশে ভূগর্ভস্থ পানি ও কৃষিজমি দূষিত করে। অসংগঠিতভাবে পোড়ানোর সময় যে ধোঁয়া ও গ্যাস বের হয়, তা বাতাসে মিশে মানবদেহে শ্বাসযন্ত্র, ত্বক ও স্নায়বিক সমস্যার জন্ম দেয়। বিশেষ করে যারা রিসাইক্লিং বা মেরামতের কাজে যুক্ত, তারা অধিকাংশ সময় কোনো সুরক্ষা ছাড়াই এসব ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। ফলে একদিকে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশে দেখা দিচ্ছে অ্যাসিডিক মাটি, দূষিত পানি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়। সংক্ষেপে, ই-ওয়েস্ট কেবল বর্জ্যই নয় এটি আজকের সময়ের এক ভয়াবহ পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সংকট।
আইন, নীতি ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু অগ্রগতি হলেও তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। ২০২১ সালের জুন মাসে “Hazardous Waste (E-waste) Management Rules, 2021” অনুমোদন দেওয়া হয়, যেখানে নির্মাতা, আমদানিকারক ও সংগ্রহকারীদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, ই-ওয়েস্ট সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য।
তবে বাস্তবে আইন প্রয়োগ ও পর্যবেক্ষণের ঘাটতি প্রকট। অনেক প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংস্থার এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা দক্ষ জনবল নেই। অন্যদিকে, পূর্বের আইন যেমন Bangladesh Environment Conservation Act, 1995 পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখলেও ই-ওয়েস্ট নিয়ে বিশেষ কোনো কার্যকর কাঠামো তখন ছিল না। সব মিলিয়ে, নীতি তৈরি হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কী করা উচিত: সচেতনতা ও করণীয়
এই সমস্যার সমাধান কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; আমাদের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের অংশীদারদেরও ভূমিকা আছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমরা পুরনো স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা অন্যান্য গ্যাজেট অযথা ফেলে না দিয়ে রিসাইক্লিং বা রি-ইউজের সুযোগ তৈরি করতে পারি। অফিস বা প্রতিষ্ঠানে পুরনো যন্ত্রগুলোকে নিয়মিত শ্রেণিবদ্ধ করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য হিসেবে ভাগ করা যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ই-ওয়েস্ট ও পরিবেশ নিয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালু করা উচিত। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে নির্দিষ্ট রিসাইক্লিং কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি।
আইন বাস্তবায়নে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদক ও আমদানিকারকদের যেন বাধ্যতামূলকভাবে রিসাইক্লিং নীতি অনুসরণ করতে হয়, আর সাধারণ মানুষ যেন জানে কোথায় পুরনো পণ্য জমা দিতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং ও রিপোর্টিং চালু হলে রিসাইক্লিং হার বাড়বে এবং প্রকৃত তথ্য পাওয়া সহজ হবে।
টেকসই ভবিষ্যতের পথে: ই-ওয়েস্ট ও SDG লক্ষ্য
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (SDGs) মূলত পৃথিবীকে টেকসই, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর করার জন্য ১৭টি বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ই-ওয়েস্ট সমস্যা সরাসরি এর মধ্যে কয়েকটি লক্ষ্যকে প্রভাবিত করছে।
SDG 12: দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন (Responsible Consumption and Production)
এই লক্ষ্য আমাদের শেখায়, পণ্য তৈরি থেকে শুরু করে ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দায়িত্বশীল হতে হবে। ই-ওয়েস্ট সঠিকভাবে রিসাইক্লিং করা বা পুনঃব্যবহার করা এই লক্ষ্য পূরণের অন্যতম শর্ত।
SDG 3: ভালো স্বাস্থ্য ও মঙ্গল (Good Health and Well-being)
ই-ওয়েস্টে থাকা সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান বাতাস, মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে মানুষের শ্বাসযন্ত্র, ত্বক ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর হুমকি তৈরি করে। ফলে এই বর্জ্য সঠিকভাবে না সামলালে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে।
SDG 13: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা (Climate Action)
ইলেকট্রনিক বর্জ্য পোড়ানোর সময় যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, তা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং ও বর্জ্য কমানো জলবায়ু রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার জন্য আইন প্রণয়ন করেছে, তবে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা ছাড়া এই লক্ষ্যগুলো পূরণ করা কঠিন। অতএব, ই-ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয় এটি টেকসই উন্নয়ন অর্জনের একটি মৌলিক শর্ত।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ কিন্তু পুরনো যন্ত্রগুলো যদি অবহেলায় পড়ে থাকে, সেগুলিই একদিন বড় বিপদের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য ই-ওয়েস্ট একটি উদীয়মান ঝুঁকি। আইন প্রণয়ন হয়েছে, যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা এখনো অনেক পিছিয়ে। আমরা যদি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যায়ে সচেতন হই তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে পারব। আপনার এলাকায় স্কুল-কলেজ, স্থানীয় সভা কিংবা বন্ধুবৃত্তে এই বিষয়টি আলোচনা করুন কারণ “একটি পুরনো ফোন” আজ ছোট মনে হলেও, কাল সেটিই হতে পারে এক বিশাল দূষণের উৎস।
লেখক: মারুফা জাহান মুমু
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি