সারাবিশ্ব

ইসরায়েল-হামাস শান্তিচুক্তিতে গাজায় উচ্ছ্বাস


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:৫২ পিএম

ইসরায়েল-হামাস শান্তিচুক্তিতে গাজায় উচ্ছ্বাস
ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের খবরে আনন্দের জোয়ার বইছে গাজা জুড়ে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান হতে যাচ্ছে—এই আশায় উল্লাসে মেতে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। কেউ খুশিতে কেঁদে ফেলছেন, কেউ হাততালি দিচ্ছেন, কেউ বাঁশি বাজাচ্ছেন, আবার কেউ নাচে-গানে প্রকাশ করছেন নিজেদের আনন্দ। গাজার আকাশে ভেসে আসছে একটাই স্লোগান—‘আল্লাহু আকবর’।

গাজার সিটি এলাকার বাসিন্দা পাঁচ সন্তানের জননী ঘাদা সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে বলেন, “হ্যাঁ, আমি কাঁদছি—কিন্তু এটা আনন্দের অশ্রু। মনে হচ্ছে, নতুন করে আবার জন্ম নিলাম। আশা করছি, এই ভয়াবহ যুদ্ধের শেষ হলো।” ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলায় ঘাদার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তিনি গত ১৫ মাস ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর, সোমবার স্থানীয় সময় বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হোয়াইট হাউসে গাজায় যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত নতুন পরিকল্পনার ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েল ও মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর ও কাতার এতে সম্মতি জানালেও, তখনও হামাস কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। অবশেষে ৩ অক্টোবর হামাস প্রস্তাবে সম্মতি জানায় এবং পরদিন ৪ অক্টোবর ট্রাম্প ইসরায়েলকে গাজায় বোমাবর্ষণ বন্ধের আহ্বান জানান।

এরপর ৬ অক্টোবর মিসরের পর্যটন শহর শারম আল শেখে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, হামাস, মিসর ও কাতারের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। টানা দুই দিন আলোচনার পর অবশেষে গতকাল রাতে ইসরায়েল ও হামাস ট্রাম্পের প্রস্তাবের প্রাথমিক পর্যায়ে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই প্রথম পর্যায় স্থায়ী হবে ছয় সপ্তাহ। এই সময়ে হামাস তাদের হাতে থাকা সব জিম্মিকে মুক্তি দেবে এবং এর বিনিময়ে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান স্থগিত রাখবে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দেবে এবং ধীরে ধীরে সেনা প্রত্যাহার করবে।

চুক্তি স্বাক্ষরের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে আনন্দ মিছিল বের হয়। তরুণ-তরুণীরা খঞ্জনি, ড্রাম ও বাঁশি বাজিয়ে, নেচে গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। খান ইউনিসের বাসিন্দা ইমান আল কৌকা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে যুদ্ধবিরতি সত্যিই বাস্তব হয়েছে। তিনি বলেন, “আজ আমাদের আনন্দের দিন, কিন্তু একই সঙ্গে দুঃখের দিনও। আমরা হাসব, আবার কাঁদবও—যাদের হারিয়েছি, যা কিছু হারিয়েছি, তা স্মরণ করব। আমরা শুধু আমাদের স্বজনদের নয়, আমাদের শহরও হারিয়েছি। ইসরায়েল আমাদের প্রাগৈতিহাসিক যুগে ঠেলে দিয়েছে।”

গাজার আরেক বাসিন্দা আহমেদ দাহমান রয়টার্সকে বলেন, “অবশেষে রক্তপাত বন্ধ হচ্ছে—এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি। তবে আমি যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত। আমরা ফিরে গেলে দেখব, আমাদের শহরে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।” দাহমান জানান, ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি নিজের বাবাকে হারিয়েছেন, কিন্তু ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ায় বাবার মরদেহ দাফন করতে পারেননি। “বাড়ি ফিরে আমার প্রথম কাজ হবে বাবার দেহের অবশেষ খুঁজে বের করা ও দাফন সম্পন্ন করা,” বলেন তিনি।

আহমেদের মা বুশরা জানান, “এই যুদ্ধবিরতি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না, কিন্তু অন্তত অন্য অনেকের জীবন বাঁচবে। আমি কাঁদব—এমন কান্না, যা আগে কোনোদিন কাঁদিনি। এই নিষ্ঠুর যুদ্ধ আমাদের কাঁদার সময়ও দেয়নি।”

গাজার রাস্তায় এখন বয়ে যাচ্ছে স্বস্তি ও আশার বাতাস। কেউ বলছেন—এবার হয়তো শান্তির সূর্য উঠবে; কেউ আবার সতর্ক করে দিচ্ছেন—এই শান্তি টেকসই করতে হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মানবতার ভিত্তিতে।

সূত্র: রয়টার্স