সারাবিশ্ব

সৌদির তিন শহরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা, আহত ১৩


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

সৌদির তিন শহরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা, আহত ১৩
ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের তিন শহরে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের চালানো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। হামলায় বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন ও যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।

সৌদি জোটের মুখপাত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফ শহরে বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে এসব হামলা চালানো হয়। হামলায় কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে হুতিরা বলে দাবি করেছে জোট।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জোটের মুখপাত্র জানান, হামলায় ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সাতটি বাড়ি ও দুটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আহতদের পরিচয়, তাঁদের মধ্যে কারও অবস্থা গুরুতর কি না কিংবা তাঁরা বর্তমানে কোথায় চিকিৎসাধীন-এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযোগ, হুতিরা পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক স্থাপনাকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। জোটের দাবি, সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তে আবাসিক এলাকা ও সাধারণ মানুষের সম্পত্তিকে টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছে, যা বেসামরিক জনগণের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে।

ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করেই সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত। ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটিতে রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট দ্রুত গভীর হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। কয়েক বছর ধরে চলা সংঘাতে ইয়েমেনে ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং মানবিক সংকট তৈরি হয়।

তবে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে বড় ধরনের সংঘর্ষ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তি ঘটেনি এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই তুলনামূলক স্থিতিশীলতাও নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে।

বিশেষ করে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও লোহিত সাগরসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে হুতিদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মানদেব। ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীও পাল্টা সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিভিন্ন সময়ে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। জোটের ভাষ্য, এসব সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে।

নতুন করে সৌদি ভূখণ্ডে এই হামলা এমন এক সময়ে হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালির নৌপথকে ঘিরে বিরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এর সঙ্গে ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক তৎপরতা বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল, বাব আল-মানদেব ও লোহিত সাগরসংলগ্ন এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। এ পথে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষকে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে দেশটিতে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন করে সংঘর্ষ বাড়লে আরও বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পাশাপাশি মানবিক পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

সৌদির তিন শহরে সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় তাই শুধু ১৩ জনের আহত হওয়ার বিষয়টিই সামনে আসছে না; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা ইয়েমেন সংকট নতুন করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য কতটা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।