সারাবিশ্ব
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক আদালতে ইরানের অভিযোগ
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল খাত গুরুতর সংকটে পড়েছে-এমন অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরান। দেশটির দাবি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে বিমান পরিচালনা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অন্যান্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব হিসেবে কয়েকটি বিমান সংস্থাকে ফ্লাইট বাতিল করতেও হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রধান আবুজার শিরউদি দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া এক বক্তব্যে জানান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইসিএও)-এর কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে তেহরান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিমান চলাচল খাতের বৈধ অধিকার রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
শিরউদি বলেন, “বিমান চলাচল শিল্পের বৈধ অধিকার রক্ষা এবং আমেরিকার আরোপ করা অবৈধ বিধিনিষেধ মোকাবিলায় ইরান আইসিএওতে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ প্রস্তুত করে জমা দিয়েছে।”
আইসিএও জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থা, যার সদর দপ্তর কানাডার মন্ট্রিয়লে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা, পরিচালনা, কারিগরি মানদণ্ড এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সংস্থাটি। ফলে ইরানের পক্ষ থেকে আইসিএওতে অভিযোগ দাখিলকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার আওতায় বিষয়টি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও অভিযোগ
শুধু আইসিএও নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও (আইসিজে) নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রধান। তিনি জানান, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে এ বিষয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
শিরউদির বক্তব্য অনুযায়ী, বিমান চলাচল খাতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এবং এর ফলে ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন কার্যক্রমে যে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞায় চাপের মুখে ইরানের বিমান খাত
ইরানের এই আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দেশটির বিমান চলাচল শিল্প নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে পড়েছে। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিমান চলাচল খাতের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কোম্পানিকে সতর্ক করে ওয়াশিংটন জানায়, ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বা সহযোগিতা অব্যাহত রাখলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।
তেহরানের অভিযোগ, এর ফলে শুধু ইরানের বিমান সংস্থাগুলোই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের সঙ্গে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। বিমান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা, আন্তর্জাতিক লেনদেন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য কারিগরি সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এরই মধ্যে নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের ভাষ্য, বেসামরিক বিমান চলাচল এমন একটি খাত, যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত। তাই এই খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছে তেহরান। এ কারণেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সামনে তুলে ধরেছে দেশটি।
দীর্ঘদিনের বিরোধে নতুন আইনি মাত্রা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বহু বছর ধরে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
বিমান চলাচল খাতের নতুন নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে আইসিএও ও আইসিজেতে অভিযোগ দাখিলের মাধ্যমে ইরান বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির পর্যায়ে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তবে ইরানের অভিযোগের পর আইসিএও বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ওপর বাস্তব কোনো প্রভাব তৈরি হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে এই অভিযোগের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ইরানের আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই নতুন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার দিকেই নজর থাকবে।