সারাবিশ্ব
সীমান্তে নতুন উত্তেজনা, উত্তর কোরিয়াকে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি সিউলের
উত্তর কোরিয়ার নতুন করে সামরিক তৎপরতা বাড়ানো এবং সীমান্তে লাউডস্পিকারে প্রচার শুরুর হুমকির পর দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। পিয়ংইয়ংয়ের একের পর এক বক্তব্য ও সামরিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়াকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সিউল।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, উত্তর কোরিয়া নতুন করে কোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক সীমারেখার কাছে লাউডস্পিকারে প্রচার এবং সতর্কতামূলক গুলি চালানোর উদ্দেশ্য ছিল সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকানো। উত্তর কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত অতিক্রম করলে তাদের পিছু হটাতেও এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার বৈধ পদক্ষেপকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। একই সঙ্গে ভিত্তিহীন অভিযোগ বন্ধ করা, সামরিক সীমারেখা অতিক্রম না করা এবং দুই দেশের মধ্যে সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ নিরসনে আলোচনার উদ্যোগে সাড়া দিতে পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিউল।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দেশটির জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জিন ইয়ং-সেউং সীমান্তবর্তী সেনা কমান্ড পরিদর্শন করে সামরিক প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেছেন। এ সময় তিনি অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোন (ডিএমজেড) এলাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা জোরদারের নির্দেশ দেন। সীমান্তে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাদের সতর্ক থাকার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জিন ইয়ং-সেউং অভিযোগ করেন, উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার বৈধ সামরিক পদক্ষেপকে উসকানি হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার দায় সিউলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। এ ধরনের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে সতর্ক করেন তিনি। দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান হলো, সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আরও অভিযোগ, সীমান্তের সামরিক সীমারেখার দক্ষিণ পাশে স্থলমাইন পুঁতে রাখার জন্য উত্তর কোরিয়া দায়ী। এসব মাইনের কারণে গত মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন সেনা গুরুতর আহত হন বলে দাবি করেছে সিউল। ঘটনাটিকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং দুই কোরিয়ার মধ্যে কার্যকর যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে দেশটি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার বক্তব্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, সীমান্তে উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজ চলার সময় দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সতর্কতামূলক গুলি চালিয়ে উত্তর কোরীয় সেনাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। দুই দেশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সীমান্তে লাউডস্পিকারে প্রচার পুনরায় শুরুর হুমকিকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার জন্য বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ক্ষমতা গ্রহণের পর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং নতুন করে প্রচারযুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা সেই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে উত্তর কোরিয়া সীমান্ত এলাকায় স্থলমাইন পুঁতে রাখা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধক স্থাপনের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। চলতি বছর এসব কার্যক্রমে প্রায় সাত হাজার কর্মী মোতায়েন করেছে পিয়ংইয়ং বলে দাবি করেছে সিউল। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সেনারা প্রায় ৫০ বার সামরিক সীমারেখা অতিক্রম করেছে বলেও অভিযোগ দক্ষিণ কোরিয়ার। এসব ঘটনার ফলে সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের কারণে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সতর্কতামূলক গুলিকে ভুল করে সরাসরি হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার কারণ হতে পারে।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিনের মতে, দুই দেশের সামরিক অবস্থান ও নীতির কঠোর প্রয়োগ সীমান্তে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, জাতিসংঘ কমান্ডের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল বোস্যাক সতর্ক করে বলেছেন, সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত সেনারা সতর্কতামূলক গুলিকে ভুল করে আক্রমণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন। এতে প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পাল্টা গুলি চালানোর ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সীমান্তকেন্দ্রিক উত্তেজনা আবারও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি, লাউডস্পিকার প্রচার পুনরায় শুরুর হুমকি এবং পরস্পরবিরোধী অভিযোগের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা কার্যকর থাকে, তার ওপরই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করছে।