সারাবিশ্ব
মিলানে বিক্ষোভ-সহিংসতা, নিরাপত্তায় ৫০০ সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি ইতালির
ইতালির মিলানে টানা দুই দিনের বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর শহরটির নিরাপত্তা জোরদার করতে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনায় নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার বিলাসবহুল পণ্যের দোকানগুলো আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যবান পণ্য সরিয়ে নেওয়া এবং দোকানের কাচের জানালা কাঠের পাটাতন ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে ঢেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছেন ব্যবসায়ীরা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি মিলানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা জানান। ক্ষমতাসীন জোটের ডানপন্থী দল লিগের এই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘কথা থেকে এবার কাজে: মিলানকে রক্ষা করতে আরও ৫০০ সেনা।’ সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সহিংসতা, লুটপাট ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উত্থাপিতব্য নিরাপত্তা প্যাকেজে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ইতালির সংবাদপত্র কোরিয়েরে দেলা সেরা জানিয়েছে, প্রস্তাবিত নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক আটক জোরদার এবং দলবদ্ধ জমায়েতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া তরুণদের অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আরও কঠোর করা এবং পার্লামেন্টে পর্যালোচনাধীন নিরাপত্তা বিলের কিছু বিধান দ্রুত কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) মিলানে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণ থাকলেও সপ্তাহান্তে তা সহিংস রূপ নেয়। কয়েক শ মুখোশধারী বিক্ষোভকারী শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় ডাস্টবিনে আগুন দেয়, দোকানপাটে লুটপাট চালায় এবং বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশের বয়স অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের হামলা ও লুটপাটের শিকার হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দোকান। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্রীড়াসামগ্রীর বিক্রেতা ডেকাথলন ও আর্ক’টেরিক্স এবং মোবাইল ফোন অপারেটর ভোডাফোনের দোকানও রয়েছে। এ ছাড়া লিভাইস, আন্ডার আর্মার ও ডেকাথলনসহ কয়েকটি ব্র্যান্ড তাদের দোকানের জানালা কার্ডবোর্ড ও কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে রেখেছে, যাতে নতুন করে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
মিলানের বিলাসবহুল কেনাকাটার জন্য বিখ্যাত ভিয়া মনতেনাপোলেওনে সড়কেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সড়কটির অধিকাংশ দোকান তাদের শোকেস থেকে মূল্যবান পণ্য সরিয়ে নিয়েছে। এই সড়কে শ্যানেল, টিফানি ও ডিওরের মতো আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের দোকান রয়েছে। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে বন্ধ রাখার পাশাপাশি সম্পদ রক্ষায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।
এদিকে, আগামী বছর জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাওয়া ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বিক্ষোভের সময় সংঘটিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সোমবার তিনি মন্ত্রী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, রাষ্ট্রের ওপর এসব হামলার জবাব সরকার কঠোরভাবে দেবে। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহিংসতা দমনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিরোধমূলক আটকাদেশের মেয়াদ বাড়ানো এবং তরুণদের অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ জোরদার করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
বিক্ষোভ চলাকালে মুখোশধারী ব্যক্তিদের একটি অংশ পুলিশের সদস্যদের লক্ষ্য করে পাথর, ডাস্টবিন ও চেয়ার ছুড়ে মারে। এর জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। ইতালির পুলিশ সূত্রে আটক ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে ২৫০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটকের কথা বলা হয়েছে, যাদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। অন্যদিকে, রোববার (১৮ অক্টোবর) মিলানে সহিংসতার ঘটনায় ২৭১ জন তরুণকে আটক করার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। সোমবারের তথ্যানুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও ২৮ জনের বিষয়ে বিচারিক কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
মিলানের পাশাপাশি উত্তর ইতালির আরও কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বোলোনিয়া, ব্রেসিয়া, বেরগামো ও তুরিনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশের রোববার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরিনে এ ঘটনায় ২৮ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইতালির এই অস্থিরতার সঙ্গে প্রতিবেশী ফ্রান্সের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিরও তুলনা করা হচ্ছে। গত শনিবার ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের জেরে কয়েক লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দেশটিতে ওই বিক্ষোভকে অন্যতম সহিংস ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবা নিয়ে বাড়তে থাকা অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে ইতালির মিলানের পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।