সারাবিশ্ব
শি জিনপিংকে ঘিরে হোয়াইট হাউসে নজিরবিহীন আয়োজন
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে ওয়াশিংটনে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রায় এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন চীনা প্রেসিডেন্ট। চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন তিনি। দুই নেতার বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, শুল্ক, বিরল খনিজ, তাইওয়ানসহ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় উঠে আসতে পারে।
সফরকে কেন্দ্র করে হোয়াইট হাউসের আয়োজনও থাকছে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। বুধবার অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে শি জিনপিংকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। পরদিন বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত হবে চীনা প্রেসিডেন্টের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। সেখানে সামরিক উড়োজাহাজের বিশেষ মহড়া বা ‘ফ্লাইওভার’-এর পাশাপাশি প্রায় ৫০০ মার্কিন সামরিক সদস্য অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
শি জিনপিংয়ের এই সফরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট বেশি। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে দুই নেতার তৃতীয় বৈঠক। শুক্রবার সফর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার কথা রয়েছে শি জিনপিংয়ের।
নভেম্বরে শেষ হচ্ছে বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ
শি জিনপিংয়ের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক। গত বছর দুই দেশের মধ্যে হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ আগামী নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সময় ওই সমঝোতা হয়েছিল।
সমঝোতার আওতায় চীনা পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল ওয়াশিংটন। এর বিনিময়ে চীনের পক্ষ থেকে শিল্প উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ রপ্তানির ওপর আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছিল।
এখন ওই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন কোনো চুক্তি বা সমঝোতা হয় কি না, সেটিই নজরে রাখছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে শুল্ক কমানো, বিরল খনিজ সরবরাহ এবং কৃষিপণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশ কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা হলেও সেখানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে একাধিক সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে। হোয়াইট হাউসের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় শুধু শুল্ক নয়, অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে চীনা কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে।
শি জিনপিং ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর বুধবারও দুই দেশের আলোচকদের মধ্যে বৈঠক চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ট্রাম্পের চাপ
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। সর্বশেষ মার্কিন সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৯১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
অন্যদিকে, গত বছরের বাণিজ্য সমঝোতার পরও যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রেয়ার আর্থ রপ্তানি কমেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে এসব বিরল খনিজের ব্যবহার থাকায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে ওয়াশিংটনের।
এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো ডেভিড স্যাকস শি জিনপিংকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পিত অভ্যর্থনাকে ‘সত্যিই নজিরবিহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে গিয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগতভাবে শি জিনপিংকে স্বাগত জানানো এবং তার সম্মানে সামরিক উড়োজাহাজের ফ্লাইওভার আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর নেতাদের জন্যও এ ধরনের আয়োজন বিরল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সফরজুড়ে আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি থাকছে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, ব্যক্তিগত বৈঠক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মতো বিভিন্ন আয়োজন।
আলোচনার বড় জায়গা দখল করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রয়োগে তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে। এই প্রতিযোগিতাকে অনেক বিশ্লেষক ‘এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ হিসেবেও বর্ণনা করছেন।
বুশ চায়না ফাউন্ডেশনের ডেভিড ফায়ারস্টেইনের মতে, শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে এআই দ্রুত দুই দেশের আলোচনার শীর্ষ অগ্রাধিকারের একটি হয়ে উঠেছে।
তবে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সামনে এসেছে। ফলে এআইয়ের বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করা উচিত কি না, তা নিয়েও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, মানবজাতির স্বার্থে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছানো উচিত, যার মাধ্যমে এআইয়ের উন্নয়ন সাময়িকভাবে স্থগিত করা এবং ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া যায়।
ট্রাম্পের সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননসহ কংগ্রেসের কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
তবে ট্রাম্প এআইকে মার্কিন অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন। চীনের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে রাখাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘যে এআইয়ে জিতবে, সে-ই জিতবে।’
তবে ডেভিড ফায়ারস্টেইনের ধারণা, দুই নেতা এআই নিয়ে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা করতে পারেন। সম্প্রতি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর বেসেন্ট বাণিজ্য ও এআই নিয়ে আলোচনা ‘খুবই সফল’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
তাইওয়ান ইস্যুতেও থাকবে উত্তাপ
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি তাইওয়ান। ফলে শি জিনপিং ও ট্রাম্পের বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে।
তাইওয়ানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেস অনুমোদন করেছে। এখন সেটিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন। তবে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কারণে ট্রাম্প আপাতত অনুমোদন স্থগিত রেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে চীন। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের সঙ্গে ‘পুনর্মিলনের’ কথা বলে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি।
ডেভিড ফায়ারস্টেইনের মতে, শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি আরও পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের কাছ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি চাওয়া হতে পারে। এমনকি অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও প্রভাব ফেলতে পারে আলোচনায়
যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনও বর্তমানে অর্থনৈতিক বিভিন্ন চাপের মুখোমুখি। ফলে চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা এবং নতুন বাজার ও বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আরও গভীর করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব দিতে পারেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই চীনকে নিয়ে কঠোর অবস্থানের সমর্থক রয়েছেন। ফলে নতুন কোনো বড় চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হবে না।
গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ডকে একটি চিঠি দেন। জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন কর্মসংস্থান সুরক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কমানোর বা ছিন্ন করার আহ্বান জানান।
এ কারণে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থার মতো বিষয়ে নতুন সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সরাসরি যোগাযোগে গুরুত্ব ট্রাম্পের
সব মিলিয়ে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বাণিজ্য ও শুল্ক থেকে শুরু করে রেয়ার আর্থ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান এবং দুই দেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পর্ক-সবকিছু মিলিয়ে ওয়াশিংটনে শি-ট্রাম্প বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ন্যাশনাল কমিটি অন ইউএস-চায়না রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট স্টিফেন অরলিনসের মতে, ট্রাম্প মনে করেন চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে সংঘাতের দিকে যেতে দেওয়া উচিত নয়। তার মতে, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তিনি ও শি জিনপিং যত বেশি সরাসরি বৈঠক করবেন, দুই দেশের সম্পর্ক তত বেশি সংঘাত এড়ানোর সুযোগ পাবে।
ফলে শি জিনপিংয়ের এবারের সফরে বড় কোনো বাণিজ্যচুক্তি বা কূটনৈতিক সমঝোতা হয় কি না, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের গতিপথে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।