জাতীয়
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকা নিয়ে এখনো হয়নি ঐকমত্য
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও এর গঠন কাঠামো এবং প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো মতৈক্য হয়নি।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদসহ চারটি দল লিখিতভাবে বিভিন্ন প্রস্তাব দিলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’-এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৫তম দিনের সংলাপে এই ইস্যুতে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পরও প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় সিদ্ধান্ত হয়, রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ ফোরামে আলোচনা করে আগামী মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) মতামত জানাবে।
বৈঠক শেষে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, বিভিন্ন দলের লিখিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে কমিশন একটি সংশোধিত সমন্বিত খসড়া প্রস্তাবনা প্রস্তুত করেছে। এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন ও প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, দলগুলোর চূড়ান্ত মতামতের ভিত্তিতে আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যেই ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা আদালতের রায়ে সম্ভব না হলে সংসদে আইন প্রণয়ন করেও তা চালু করা যেতে পারে।” তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধি এবং আরও দুই সদস্য থাকবেন। প্রয়োজন হলে প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে র্যাংকড চয়েস ভোটিংয়ের মাধ্যমে একজন নিরপেক্ষ নাগরিককে নির্বাচন করা হবে।
কমিশনের খসড়া অনুযায়ী, নির্বাচনের জন্য গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৯০ দিনের জন্য দায়িত্ব পালন করবে। প্রয়োজনে আরো ৩০ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। প্রধান উপদেষ্টার ক্ষমতা হবে সীমিত, মূলত রুটিন প্রশাসনিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকবে।
আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল—একই ব্যক্তি কি প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান—এই তিন পদে একসঙ্গে থাকতে পারবেন কি না। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দেয়।
বিএনপি মনে করে, একটি ব্যক্তি যদি দলের প্রধান হন, তবে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা ঠিক নয়। এটি তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও এনসিপি মনে করে, একজন ব্যক্তির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতৃত্ব বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে।
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা একই ব্যক্তি হতে পারেন, তবে তিনি যেন দলীয় প্রধান না হন। এতে দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গঠন সহজ হবে এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
আলোচনার শুরুতে আলী রীয়াজ বলেন, “আমরা চাই চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সনদ চূড়ান্ত হোক। ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য সৃষ্টি হয়েছে, এখন প্রয়োজন কাঠামো ও প্রক্রিয়ায় একমত হওয়া।”
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। গত ১৪ বছর ধরে এ নিয়ে রাজনৈতিকভাবে আলোচনা ও আন্দোলন চলেছে। এখন সেই প্রচেষ্টার ফলাফল বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
ঐকমত্য কমিশনের ওই বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, সিপিবি, গণসংহতি আন্দোলন, এবি পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা পরিচালনায় ছিলেন আলী রীয়াজ, বিচারপতি এমদাদুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান, সফর রাজ হোসেন এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
সবশেষে কমিশন জানায়, সংসদের উচ্চ কক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভেদ নেই, তবে এর কাঠামো ও পদ্ধতি নির্ধারণে ভিন্নমত রয়েছে। কমিশন এ বিষয়ে নিজস্ব প্রস্তাব প্রস্তুত করছে, যা পরবর্তী আলোচনায় উপস্থাপন করা হবে।