জাতীয়
প্রধানমন্ত্রীর কাছে আলোচিত ‘বালিশ কাণ্ডের’ নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা
সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ২০২১–২২ অর্থবছরের মোট ৩৮টি নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নূরুল ইসলাম মঙ্গলবার বিকেলে এসব প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, জমা দেওয়া প্রতিবেদনের মধ্যে আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ‘বালিশ কাণ্ড’ সম্পর্কিত নিরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে প্রতিটি বালিশের দাম ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল।
প্রেস সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অস্বাভাবিক দামের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করে বলেন, এমন দামি বালিশের একটি জাদুঘরে রাখা যেতে পারে।
২০১৯ সালে রূপপুর প্রকল্পের গ্রিন সিটি আবাসিক ভবনের জন্য আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক পণ্য কেনাকাটায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ সামনে আসে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ১৬৯ কোটি টাকার কেনাকাটায় নানা অনিয়ম হয়েছে।
এর মধ্যে প্রতিটি বালিশের দাম দেখানো হয় ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। সেই বালিশ ফ্ল্যাটে ওঠানোর খরচ ৭৬০ টাকা দেখানো হয়।
এছাড়া কভারসহ প্রতিটি কমফোর্টারের (লেপ বা কম্বলের বিকল্প) দাম দেখানো হয় ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। যদিও এর বাজারমূল্য সাড়ে ৪ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। একইভাবে বিদেশি বিছানার চাদর কেনা হয়েছে ৫ হাজার ৯৩৬ টাকায়। অথচ এর বাজারমূল্য ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা বলে খবরে বলা হয়।
পাঁচটি ২০ তলা ভবনের জন্য এসব কেনাকাটা হয়েছে। প্রতিটি তলায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য কমফোর্টার শুধু বেশি দামে কেনাই হয়নি, কেনার পর দোকান থেকে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছাতে আলাদা ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে। মাত্র ৩০টি কমফোর্টারের জন্য ৩০ হাজার টাকা ট্রাকভাড়া দেখানো হয়। একেকটি কমফোর্টার খাট পর্যন্ত তুলতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ হাজার ১৪৭ টাকা।
আবার কমফোর্টার ঠিকমত খাট পর্যন্ত তোলা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য তত্ত্বাবধানকারীর পারিশ্রমিক দেখানো হয়েছে প্রতিটির ক্ষেত্রে ১৪৩ টাকা। ঠিকাদারকে ১০ শতাংশ লাভ ধরে সম্পূরক শুল্কসহ সব মিলিয়ে প্রতিটি কমফোর্টারের জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ২২ হাজার ৫৮৭ টাকা।
শুধু কমফোর্টার নয়, চাদরের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে। ৩০টি চাদর আনতে ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়েছে। আর ভবনের নিচ থেকে খাট পর্যন্ত তুলতে প্রতিটি চাদরের জন্য মজুরি দেখানো হয়েছে ৯৩১ টাকা।
শুধু বালি, কমফোর্টার বা চাদর নয়, ইলেকট্রনিক সামগ্রী কেনাকাটাতেও অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়। ভবনের প্রতি ফ্লাটের জন্য একটি রেফ্রিজারেটর কেনার খরচ দেখানো হয়েছে ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা। রেফ্রিজারেটর ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৫২১ টাকা।
প্রতিটি টেলিভিশন কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে ৮৬ হাজার ৯৭০ টাকা। টেলিভিশন ওপরে ওঠাতে দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ৬৩৮ টাকার খরচ। এরকম বৈদ্যুতিক চুলা, বৈদ্যুতিক কেটলি, রুম পরিষ্কারের মেশিন, ইলেকট্রিক আয়রন, মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি কেনাকাটা ও ভবনে তুলতে অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়।
একেকটি খাট কেনা দেখানো হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৫৭ টাকা। আর খাট ওপরে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৩ টাকা।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করে এবং ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।