জাতীয়

রংপুরে আবু সাঈদের উন্মুক্ত বুকেই ভেঙে পড়েছিল হাসিনার ক্ষমতার দম্ভ


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩০ এএম

রংপুরে আবু সাঈদের উন্মুক্ত বুকেই ভেঙে পড়েছিল হাসিনার ক্ষমতার দম্ভ
ছবিঃ সংগৃহীত

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের নিহত হওয়ার পর থেকেই উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর। তার আত্মত্যাগ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। বিশেষ করে ৩ আগস্টের পর আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বহুগুণ বেড়ে যায়। ওই দিন ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি এবং অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা আসার পর আন্দোলনটি ছাত্রদের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বস্তরের মানুষের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
 
বৃষ্টিভেজা সেই দিনে রংপুরের রাজপথে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময় এবং জনস্রোতের বিস্ফোরণ ৪ ও ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয়ের পথ আরও ত্বরান্বিত করে।
 
তবে এই গণঅভ্যুত্থানের মূল্য ছিল রক্তাক্ত। জুলাই আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে ছয়জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন দুই শিক্ষার্থী, দুই ব্যবসায়ী, একজন অটোরিকশাচালক ও একজন স্বর্ণশ্রমিক। অথচ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো মামলার চার্জশিট আদালতে জমা হয়নি। এখনো শনাক্ত হয়নি গুলি চালানো অস্ত্রধারীরা, উদ্ধার হয়নি ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রও।
 
৪ আগস্ট: রংপুরজুড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
 
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিন ৪ আগস্ট রংপুরজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। আন্দোলনকারীদের দাবি, ৩ আগস্ট পুলিশের নীরব ভূমিকা সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। পরদিন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র ও পিস্তল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন।
 
দুপুরে জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে সরকারপন্থিদের মিছিল বের হলে টাউন হল এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে সিটি বাজার, সুপার মার্কেট, পায়রা চত্বর ও সিটি করপোরেশন এলাকায় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
 
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা লাঠি, লোহার পাইপ ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। পরে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্র-জনতা।
 
সেদিন সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের পরশুরাম থানা সভাপতি ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারাধন রায় হারা, তার ভাগ্নে শ্যামল চন্দ্র রায়, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা খাইরুল ইসলাম খসরু, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল সাত্তার সবুজ এবং ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মাহমুদুল ইসলাম মুন্না।
 
সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে উপজেলাগুলোতেও
 
৪ আগস্টের সংঘর্ষ শুধু নগরীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ ও গঙ্গাচড়াসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ছাত্র-জনতার পাশাপাশি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও প্রতিরোধে অংশ নেন।
 
১৬ থেকে ১৯ জুলাই: রক্তে রঞ্জিত রংপুর
 
১৬ জুলাই পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে শহীদ হন আবু সাঈদ। তার সেই দৃশ্য দেশ-বিদেশে আলোড়ন তোলে এবং আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।
 
১৮ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া। ওই দিন বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়, ডিবি অফিস, তাজহাট থানা ও নবাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
 
১৯ জুলাই বিএনপির সমাবেশ শেষে হাজারো ছাত্র-জনতা মিছিলে যোগ দিলে সিটি করপোরেশন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন, ফল বিক্রেতা মেরাজুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ-আল তাহির।
 
কেউ হারিয়েছেন চোখ, কেউ পা
 
৪ আগস্টের সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হন। অনেকেই পুলিশি হয়রানির আশঙ্কায় হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেন।
 
জুম্মাপাড়ার আবেদ আলী একটি চোখ হারান। পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী ও মমদেল হোসেন পুলিশের গুলিতে একটি করে পা হারান। তাদের মতো আরও অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
 
'আবু সাঈদের দুই হাতই পতনের সূচনা'
 
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ বলেন, "পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদ যেদিন দুই হাত প্রসারিত করেছিলেন, সেদিনই শেখ হাসিনার দমননীতির পতনের ঘণ্টা বেজে গিয়েছিল। তার সেই সাহস দেশের মানুষকে রাজপথে নামতে অনুপ্রাণিত করেছে।"
 
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দুই বছরেও আন্দোলনে গুলি চালানো ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি।
 
শহীদ পরিবারের একটাই দাবি—বিচার
 
নিহত সাজ্জাদ হোসেনের মা ময়না বেগম বলেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। তিনি সরকারের কাছে দ্রুত বিচার এবং শহীদ পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
 
মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন বলেন, স্বামী হারানোর পর দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি সহায়তা পর্যাপ্ত নয় বলেও জানান তিনি।
 
মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন
 
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের ঘটনায় দায়ের হওয়া ছয়টি হত্যা মামলায় মোট দুই হাজার ৬৩৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ১২৫ জন। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
 
এ বিষয়ে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী বলেন, তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং কয়েকটি মামলার চার্জশিট প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে সেগুলো।
 
৫ আগস্ট: বিজয়ের উল্লাস
 
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রংপুরজুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। শাপলা চত্বর, পায়রা চত্বর, টাউন হল, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন এলাকায় বিজয় মিছিল বের হয়। জাতীয় পতাকা হাতে মানুষ রাজপথে নেমে আসে।
 
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও আনন্দ মিছিল করে। কোথাও মিষ্টি বিতরণ, কোথাও শুকরিয়া নামাজ আদায় করা হয়। একই দিন বিক্ষুব্ধ জনতা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যালয় ও কয়েকজন নেতার বাড়িতে ভাঙচুর চালায়।