জাতীয়
কৃষিকে লাভজনক করতে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দিতে হবে: রাষ্ট্রপতি
কৃষি খাতকে লাভজনক করতে সরকারকে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, কৃষি খাতে ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন হলেও বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ ক্ষেত্রে বাধা দেয়।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আয়োজনে কৃষি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় দেশের কৃষি খাতের বিদ্যমান সমস্যা, উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং গবেষণার মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
কৃষি খাতের সমস্যাগুলো তুলে ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যেসব ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষক ফসল উৎপাদন করার পর অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না। অন্যদিকে, চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ কিনতে গিয়ে তাঁদের বাড়তি দাম দিতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষকের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
তিনি বলেন, কৃষি এখন অনেক ক্ষেত্রেই লাভজনক পেশা হিসেবে টিকে থাকতে পারছে না। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর মতো আয় না থাকায় কৃষিকাজে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি কৃষিকে লাভজনক করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
কৃষিপণ্যের সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ফল ও সবজি দীর্ঘদিন ভালো রাখতে আধুনিক হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকলে উৎপাদনের পরপরই কম দামে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে কৃষকদের বাধ্য হতে হবে না। পাশাপাশি বাজারব্যবস্থার উন্নয়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
কৃষি উৎপাদনের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, পেঁয়াজ চাষে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন আর আগের মতো পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন হয় না বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফল উৎপাদনেও দেশের অগ্রগতি রয়েছে। তবে উৎপাদিত ফলের সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে।
জমির উর্বরতা রক্ষায় কৃষকদের সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, জমিতে সারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা অপরিকল্পিতভাবে সার প্রয়োগের ফলে মাটির গুণাগুণ ও উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি কার্যকর গবেষণা প্রয়োজন।
কৃষি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা ও অবসরকালীন সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে হলেও কৃষি বিজ্ঞানীদের পেনশনের ব্যবস্থা করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়েও কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি অনেক প্রতিষ্ঠানে বিস্তার লাভ করেছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সবাইকে ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, দেশের অনেক কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। এখন এসব পণ্যের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উন্নত করে বিদেশি বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু দেশের ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ নয়, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষির ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে উন্নত কীটনাশক উদ্ভাবন ও ব্যবহারের বিষয়ে গবেষণা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে আসে।