জাতীয়

ঢাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি মনোরেল রুট চালুর পরিকল্পনা সরকারের


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ পিএম

ঢাকায় ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি মনোরেল রুট চালুর পরিকল্পনা সরকারের
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করতে ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি মনোরেল রুট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত মনোরেল রুটগুলোর প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে রুট নির্বাচন ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে চূড়ান্ত দুটি রুট নির্ধারণ করা হবে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত মনোরেল ব্যবস্থা রাজধানীর গণপরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও দক্ষ পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে এটি চালু করা সম্ভব হলে নগরবাসীর যাতায়াত আরও সহজ হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় যাত্রীদের চলাচলের চাহিদা বেশি, সেসব এলাকায় গণপরিবহনের সুযোগ বাড়বে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত মনোরেল রুটগুলোর সঙ্গে বর্তমানে চালু থাকা এবং পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপনের সুযোগ রাখা হবে। বিশেষ করে মেট্রোরেলে যাতায়াতকারী যাত্রীদের গন্তব্যের শেষ অংশে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মনোরেল কার্যকর সংযোগব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মধ্যে গণপরিবহন যোগাযোগ আরও সমন্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) ইতোমধ্যে মনোরেল রুটের প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এখন প্রস্তাবিত রুটগুলোর বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ চলছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিস্তারিত নকশা জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

মনোরেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ঢাকা মহানগর অঞ্চলের বিদ্যমান ও পরিকল্পিত গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে এর সমন্বয় নির্ধারণে ডিটিসিএ ‘কনসালট্যান্সি সার্ভিস ফর প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি অব মনোরেল অ্যালাইনমেন্ট ইন্টিগ্রেশন উইথ মাস ট্রানজিট নেটওয়ার্কস ইন ঢাকা মেট্রোপলিটন রিজিয়ন’ শীর্ষক পরামর্শক চুক্তি করেছে। এ সমীক্ষার আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার যাত্রী চাহিদা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং মনোরেল নির্মাণের উপযোগিতা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রস্তাবিত মনোরেল রুটগুলোর বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের জন্য সরকারি রাজস্ব বাজেট থেকে ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ সমীক্ষার মাধ্যমে মনোরেল চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সংযোগের উপায় নির্ধারণ করা হবে।

হালনাগাদ সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) ঢাকায় প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি মনোরেল রুটের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব রুটের মধ্য থেকে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রুট তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন এবং পুরো সমীক্ষা ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত রুট নির্বাচনের ক্ষেত্রে যাত্রী চাহিদা, সম্ভাব্য সুফল, নির্মাণ ব্যয় এবং আর্থিক বাস্তবতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত পাঁচটি প্রস্তাবিত রুটের মধ্যে রয়েছে পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি হয়ে বিমানবন্দর-বসুন্ধরা পর্যন্ত ২৫ দশমিক ২ কিলোমিটার, মধ্য বাড্ডা-ভুলতা পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার, রামপুরা-ডেমরা পর্যন্ত ১০ দশমিক ৩ কিলোমিটার, মোহাম্মদপুর-পোস্তগোলা পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার এবং উত্তরা সেন্টার হয়ে বিমানবন্দর-সাভার পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ।

এ ছাড়া পরিকল্পনায় আরও কয়েকটি সম্ভাব্য রুটের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত ৯টি স্টেশনসহ মনোরেল-৮, আলুব্দী থেকে পশ্চিম আগারগাঁও অথবা শ্যামলী পর্যন্ত ১০টি স্টেশনসহ মনোরেল-১০ এবং পল্টন থেকে সদরঘাট অথবা ঝিলমিল পর্যন্ত ৬ কিংবা ১১টি স্টেশনসহ মনোরেল-১৩ রুটের প্রস্তাব রয়েছে।

বুয়েটের একজন পরামর্শক জানান, ঢাকা মহানগর এলাকার জন্য প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা, সম্ভাব্য স্টেশনগুলোর যাত্রী আকর্ষণের পরিধি, গণপরিবহন সেবার অপ্রাপ্যতা, যানজটপূর্ণ এলাকা, ডিপো নির্মাণের জন্য জমির প্রাপ্যতা এবং ভবিষ্যতে রুট সম্প্রসারণের সুযোগ। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করেই মনোরেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ সমীক্ষায় প্রস্তাবিত রুটের অবস্থান, সম্ভাব্য স্টেশন ও ডিপোর স্থান নির্ধারণ, যাত্রী চলাচলের সম্ভাব্য চাহিদা, কারিগরি ও কাঠামোগত উপযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয়, যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা, পরিচালন ব্যয় এবং প্রকল্পটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক যৌক্তিকতাও বিশ্লেষণ করা হবে। এ কাজে দেশীয় ও প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।

মনোরেল মূলত এমন একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা, যেখানে ট্রেন উড়ালপথে নির্মিত একটি বিশেষ রেলকাঠামোর ওপর দিয়ে চলাচল করে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে সড়কের জায়গা সীমিত এবং প্রচলিত গণপরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকায় মনোরেল কতটা কার্যকর হতে পারে, তা যাচাই করছে ডিটিসিএ। বিশেষ করে সীমিত জায়গার মধ্যে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি এ সমীক্ষায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসন, গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নগরবাসীর যাতায়াত সহজ করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মনোরেল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের ভিত্তিতে নেওয়া এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঢাকার গণপরিবহন নেটওয়ার্কে নতুন একটি ব্যবস্থা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে প্রকল্পটির চূড়ান্ত রুট নির্বাচন, অর্থনৈতিক ও কারিগরি মূল্যায়ন এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করছে ২০৩০ সালের মধ্যে মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা কতটা বাস্তব রূপ পাবে।