রাজনীতি
৭ নভেম্বরের চেতনায় ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় বিএনপি প্রস্তুত: রিজভী
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বহুদলীয় গণতন্ত্র রক্ষার পাশাপাশি সব ধরনের অগণতান্ত্রিক ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় বিএনপি প্রস্তুত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির নেতা রুহুল কবির রিজভী।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে রিজভী বলেন, ওই বছরের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পাল্টাপাল্টি সংঘাত ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সে সময় দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা হতাশায় পর্যবসিত হয়। ২, ৩ ও ৪ নভেম্বর দেশ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যায়। আবারও বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হবে কি না কিংবা নাগরিকদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের মানুষ নতুন করে আশার দিশা খুঁজে পায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ লাভ করে। পরবর্তী সময়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও উৎপাদনের পথে এগিয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা অর্জন করে। তাঁর নেতৃত্বেই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে দাবি করেন বিএনপির এই নেতা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণে যাবে না এবং দেশের সার্বভৌমত্ব আরও সুদৃঢ় হবে-এমন প্রত্যয় থেকেই ৭ নভেম্বরের পর গণতান্ত্রিক ও বহুদলীয় বাংলাদেশ গঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে শহীদ জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হলেও ৭ নভেম্বরের চেতনা জাতিকে স্বাধীনতা, মুক্তি, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে দেশে আবারও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই চেতনা জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছে।
রিজভীর অভিযোগ, ২০০৯ সালের পর দেশে আবারও বাকশালের নতুন রূপ তৈরি করা হয়েছিল। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাঁর দাবি, ওই সময়ে গুম, খুন ও গুপ্তহত্যার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। সাধারণ মানুষ ভয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারত না, এমনকি রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রেও আতঙ্কে থাকত।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি যুগান্তকারী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এই আন্দোলনের পেছনেও ৭ নভেম্বরের চেতনা ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
৭ নভেম্বরের তিনটি মূল অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, স্বাধীনতা রক্ষা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা-এই তিনটি বিষয়ই ছিল ওই দিনের মূল চেতনা। তাঁর দাবি, এই প্রত্যয় ধারণ করেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশের মানুষ অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজয় অর্জন করেছে।
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমানে একটি জনবান্ধব সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী জনগণকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন না; বরং কৃষক ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছেন। বিনামূল্যে সার বিতরণ, কৃষক ও হতদরিদ্রদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড প্রদান এবং দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
তিনি আরও দাবি করেন, দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত সাত থেকে আট মাসের মধ্যেই প্রায় এক হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রিজভী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে গলির মধ্যে ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও প্রচারণা ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে কেউ বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভিন্ন বক্তব্য দিলে কিংবা কোনো রাজনৈতিক দল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করলে দেশের জনগণ তা পর্যবেক্ষণ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সবশেষে রিজভী বলেন, দেশের মানুষ ও জাতীয়তাবাদী শক্তি ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতির চেতনায় উজ্জীবিত। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার এই চেতনাকে ধারণ করেই দেশের সব অগণতান্ত্রিক ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় বিএনপি প্রস্তুত রয়েছে।