মতামত

নগ্নতার মানদণ্ড ও আধ্যাত্মিকতার কারবার: কোন পথে আমাদের মানচিত্র?


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:০৯ পিএম

নগ্নতার মানদণ্ড ও আধ্যাত্মিকতার কারবার: কোন পথে আমাদের মানচিত্র?
ছবি: সংগৃহীত

নদীমাতৃক বাংলায় আজ নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- সৌন্দর্যের সংজ্ঞা কি কেবলই একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চের সোনালি খেতাবে বাঁধা? যে খেতাবের জন্য একজন বঙ্গললনাকে খুলে ফেলতে হয় তার শতবর্ষের ঐতিহ্য, সেই খেতাবের ভার আমাদের কাঁধ কেন বহন করবে? আমাদের মানদণ্ড কি তবে বিশ্ববাজারের "ভোগ্যপণ্য"-এর তালিকা ধরে এগোবে, নাকি নিজস্ব মাটি ও মহিমার সুরে গান গাইবে?

থাইল্যান্ডের মঞ্চে যখন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিযোগী তানজিয়া জামান মিথিলা 'মিস ইউনিভার্স ২০২৫'-এর কষ্টিপাথরে নিজেকে ঘষছেন, তখন একদিকে যেমন উড়ছে জাতীয় পতাকা, তেমনই আর এক দিকে সমাজের গভীরে জন্ম নিচ্ছে এক অস্বস্তিকর জিজ্ঞাসা। প্রশ্নটি কেবল একটি পোশাকের নয়, এটি আমাদের মূল্যবোধ, স্বাতন্ত্র্য এবং তথাকথিত 'প্রগতির মুখোশ উন্মোচনের।

সৌন্দর্য: নিলামে ওঠা এক পণ্য?

শাড়ি, চুড়ি আর আলতার ছোঁয়ায় যে নারীত্বের পূর্ণতা, তাকে কেন একটি বহুজাতিক কর্পোরেট আয়োজনের মাপকাঠিতে 'আংশিক নগ্ন' হয়ে প্রমাণ করতে হবে? প্রতিযোগিতাটির নাম 'মিস ইউনিভার্স' হলেও, এর বিকিনি পর্বটি যেন এক অলিখিত শর্ত- "বিশ্বজনীন হতে হলে, শরীর দেখাতে হবে।" এই প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে গেলে নারীকে নিজেকে 'শত-সহস্র দেহ-চাটা জোড়া চোখের' আর টিআরপি শিকারি ক্যামেরার সামনে 'মেলে ধরতে হয়- তবু কেনো আমাদের অংশ নিতেই হবে এহেন নামকাওয়াস্তে নগ্নতার চর্চায়!

নারীবাদীরা যখন নারীকে 'ভোগ্যপণ্য' হিসেবে উপস্থাপনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তখন এই প্রতিযোগিতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন প্রতিযোগী আসলে নিজেকে কী হিসেবে উপস্থাপন করেন? এটি কি নারীর 'নিজের শরীর নিয়ে স্বাধীনতা' প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম, নাকি বহু শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক চোখের চাহিদা মেটানোর এক আধুনিক, ঝকঝকে মঞ্চ? এটি যেন এক চরম দ্বৈরথ- একদিকে 'স্বাধীনতার স্লোগান, অন্যদিকে 'শরীরের প্রদর্শন'। এই দ্বিমুখী স্রোতে পড়ে আমাদের সমাজ দ্বিধাবিভক্ত।

এক বঙ্গললনা, যিনি তার জন্মভূমিকে বিশ্ব-দরবারে তুলে ধরতে চান, তিনি কি তবে ঐতিহ্য আর তথাকথিত 'আধুনিকতার জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন? যখন পোশাক খুলে তিনি হেঁটে যান, তখন তিনি কি কেবল নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন, নাকি সেই বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, যা নারীর শরীরকে একটি 'গ্ল্যামারাস' মোড়কে নিলামে তোলে? এই খেতাব কি তবে আমাদের আত্মমর্যাদাকে উঁচু করে, নাকি একপ্রকার 'স্বেচ্ছাকৃত নগ্নতা'র বিনিময়ে অর্জিত এক 'স্বর্ণখচিত শৃঙ্খল'?

আধ্যাত্মিকতার কারবার: সেজদার ভুল ঠিকানা

আমার প্রশ্ন শুধু নারীর শারীরিক উপস্থাপনায় থেমে নেই, প্রশ্ন আছে আমাদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের মূল ভিত্তি নিয়েও। চলচ্চিত্রের পর্দায় বা বাস্তব জীবনে মাজার সংস্কৃতিকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা কি সত্যিই আমাদের ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ?

"একজন মৃতের বাঁধাই করা কবরের সামনে সেজদা করা বা সেখানে গিয়ে নিজের দুঃখ দুর্দশা জানিয়ে কিছু চাওয়া, ইসলামের কোন অধ্যায়ে বলা আছে?” এটি কেবল ধর্মীয় রীতির প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের মানসিক পঙ্গুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে। ইসলাম ধর্ম পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে, সৃষ্টিকর্তা এবং বান্দার মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারী থাকতে পারে না। সমস্ত প্রার্থনা, সেজদা ও সাহায্য চাওয়ার একমাত্র ঠিকানা হলেন আল্লাহ। অথচ আমাদের সমাজে, বিশেষ করে চলচ্চিত্রে, এমনভাবে মাজার সংস্কৃতিকে মহিমান্বিত করা হয়, যেন মৃত ব্যক্তিরাই আমাদের দুঃখ-দুর্দশা মোচন করার ক্ষমতা রাখেন।

এই অন্ধ বিশ্বাস শিরক-এর শামিল, যা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থি। কিন্তু এই চরমতম ধর্মীয় বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কেন আমাদের সমাজের বুদ্ধিজীবী এবং ধর্মীয় নেতারা ততটা সোচ্চার নন? এর কারণ কি-

ভোট ব্যাংক: মাজার-কেন্দ্রিক বিপুল জনসমাবেশ একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার।

ব্যাবসায়িক সুবিধা: মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দান-খয়রাত এবং অর্থনৈতিক বলয়।

মানুষের সহজলভ্য আশ্রয়: যেখানে মানুষ দ্রুত ফল লাভের আশায় এক ধরনের অলৌকিক শক্তির কাছে ছুটে যায়।

আমরা একদিকে যেমন নারীদেহ প্রদর্শনের 'ইসলামিক দৃষ্টিকোণ' নিয়ে সরব, তেমনই অন্যদিকে ইসলামের মূল শিক্ষাকে উপেক্ষা করে মাজার সংস্কৃতির চর্চা করে যাচ্ছি। এই দ্বৈত নৈতিকতা আমাদের জাতির এক গভীর ক্ষত।

আত্ম-বিস্মৃতির গোলকধাঁধা-

আমরা একটি এমন জাতি, যারা নিজের ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রদর্শন করতে লজ্জিত হই, কিন্তু অন্য জাতির অনুকরণে 'বিকিনি' পরিধান করে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আমরা এমন এক প্রজন্ম, যারা জীবন্ত সৃষ্টিকর্তাকে বাদ দিয়ে মৃত ব্যক্তির কবরে গিয়ে সাহায্য চাই।

মিস ইউনিভার্সের মঞ্চ বা মাজারের প্রাঙ্গণ- উভয় স্থানেই যেন আমাদের আত্ম-বিস্মৃতির প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। একটি আমাদের সংস্কৃতিকে 'বিক্রি' করতে শেখায়, অন্যটি আমাদের ধর্মকে 'বিকৃত' করতে শেখায়। এই খেতাব আমাদের দরকার নেই, যদি তা আমাদের বাঙালি নারীর আত্মমর্যাদা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে জলাঞ্জলি দিয়ে অর্জন করতে হয়।

এখনই সময় মানসিকতা পরিবর্তনের-

আমাদের সৌন্দর্য ফুটে উঠুক আমাদের শিল্প, সাহিত্য, মেধা ও মানবিকতায়। আমাদের আধ্যাত্মিকতা ফিরে আসুক সেই সরল পথে, যা আমাদেরকে সরাসরি এক ও অদ্বিতীয় সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে যুক্ত করে। তবেই হয়তো এই জাতি তার সঠিক মানচিত্রে দৃঢ় পদক্ষেপে হেঁটে যেতে পারবে, বিকিনি বা মাজারের গোলকধাঁধা পেরিয়ে।

লেখক: মাহাবুব আশরাফ আহাদ,
গণমাধ্যমকর্মী।