মতামত

‘ইতিহাসের আদালতে স্বৈরাচারের কখনো প্রত্যাবর্তন হয়না’


মতামত ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৪ পিএম

‘ইতিহাসের আদালতে স্বৈরাচারের কখনো প্রত্যাবর্তন হয়না’
ছবিঃ ঢাকা প্রকাশ।

মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতি প্রায়ই আবেগপ্রবণ, কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি নির্মম। ক্ষমতাচ্যুত কোনো শাসকের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে জনপরিসরে যত আলোচনা হোক, ইতিহাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাদের এক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘোরে না। এই সত্যটি কেবল রাজনৈতিক তত্ত্বের বিষয় নয়; এটি সভ্যতার ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত অভিজ্ঞতা। সাম্রাজ্য উঠেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে; রাজা ফিরেছেন, নির্বাসিত শাসক ফিরে এসেছেন; কিন্তু ইতিহাস কখনোই একই মঞ্চ, একই দর্শক, একই নাটক এবং একই পরিণতি দ্বিতীয়বার মঞ্চস্থ করেনি।

স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার স্থায়িত্বের ভ্রম। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে রাষ্ট্র, জাতি, প্রতিষ্ঠান এবং ইতিহাস তার ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে অভিন্ন। এখানেই স্বৈরাচারের অন্তর্নিহিত ট্র্যাজেডি। লর্ড অ্যাকটনের বিখ্যাত উক্তি “Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely” কেবল নৈতিক অবক্ষয়ের কথা বলে না; এটি রাজনৈতিক অন্ধত্বেরও ব্যাখ্যা দেয়। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা শাসককে এই বিভ্রমে আচ্ছন্ন করে যে তিনি ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, অথচ বাস্তবে ইতিহাসই তাকে ব্যবহার করছে।

ইতিহাস বলে, ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখা সহজ কিন্তু ইতিহাসকে উল্টো দিকে ঘোরানো অসম্ভব। হান্না আরেন্ট তাঁর The Origins of Totalitarianism-এ দেখিয়েছেন, সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে এমন এক কৃত্রিম ঐক্য তৈরি করতে চায়, যেখানে শাসকের পতনকে রাষ্ট্রের পতন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। শাসকের পতনের পরই স্পষ্ট হয় যে রাষ্ট্র টিকে থাকে, সমাজ পরিবর্তিত হয়, আর ক্ষমতার ভাষা বদলে যায়।

স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, তারা নিজেদের রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করতে শুরু করে। তারা বিশ্বাস করে, রাষ্ট্র মানেই দল, দল মানেই নেতা, আর নেতা মানেই জাতি। এই ধারণা যতদিন টিকে থাকে, ততদিন ক্ষমতার কাঠামোও অটুট মনে হয়। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে- রাষ্ট্র ব্যক্তির চেয়ে বড়, সমাজ দলের চেয়ে বড়, আর সময় যেকোনো শাসকের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

প্রাচীন রোমে Julius Caesar নিজেকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন যেখানে তাঁর ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রের ওপর ছায়া ফেলেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর রোম আর আগের প্রজাতন্ত্রে ফিরে যায়নি, কিন্তু সিজারের ব্যক্তিগত আধিপত্যও আর ফিরে আসেনি। ইতিহাস নতুন পথ বেছে নিয়েছিল।

ইংল্যান্ডে Oliver Cromwell রাজতন্ত্র উৎখাত করে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই ব্যবস্থাও টেকেনি। কিন্তু ইংল্যান্ডও আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। বরং পরবর্তী সময়ে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের জন্ম হয় একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।

ফরাসি ইতিহাসে Napoleon Bonaparte এর প্রত্যাবর্তনের ঘটনা বহুল আলোচিত। তিনি নির্বাসন থেকে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় শাসন মাত্র একশ দিনের ছিল। এই ঘটনা ইতিহাসের একটি গভীর শিক্ষা বহন করে ক্ষমতায় সাময়িক প্রত্যাবর্তন আর আগের ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনা এক জিনিস নয়।
ইতালিতে Benito Mussolini এবং জার্মানিতে Adolf Hitler নিজেদের অপরাজেয় মনে করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের পতনের পর সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা আর ফিরে আসেনি। যুদ্ধ-পরবর্তী ইতালি ও জার্মানি নতুন সংবিধান, নতুন প্রতিষ্ঠান এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। অতীতের শিক্ষা ভবিষ্যতের ভিত্তি হয়েছে।

এই উদাহরণগুলোর উদ্দেশ্য কোনো দেশের রাজনীতিকে অন্য দেশের সঙ্গে এক করে দেখা নয়। বরং একটি সাধারণ সত্যকে বোঝানো যখন কোনো দীর্ঘস্থায়ী শাসনের অবসান ঘটে, তখন শুধু সরকার বদলায় না বদলে যায় মানুষের মানসিকতা, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা। সেই পরিবর্তনের পর অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই প্রযোজ্য। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে পতন হয় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী সময়। দেশ ছেড়ে শুধুমাত্র তার আপনজনদের নিয়ে পালিয়ে যান এই ফ্যাসিস্ট। কিন্তু বর্তমানে প্রায়শই ভার্চুয়ালে ফাঁকা আওয়াজ দিতে শোনা যায় যে খুব শীঘ্রই তারা ফিরে আসবে, অপেক্ষা কর আমরা আবার আসছি‌ ইত্যাদি ইত্যাদি বাণী। তাদের সমর্থকদেরও এই বিশ্বাসে উজ্জীবিত রাখা হয় কিন্তু রাজনীতি আশাবাদ আর ইতিহাসের বাস্তবতা এক জিনিস নয়। ইতিহাস আবেগ দিয়ে লেখা হয় না; ইতিহাস লেখা হয় সময়, পরিবর্তন ও বাস্তবতা দিয়ে। তাই সেই ফ্যাসিস্ট যতই প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখুক না কেন ইতিহাস কখনোই একই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে আনে না। 

দার্শনিক Heraclitus বলেছিলেন, “একই নদীতে কেউ দু’বার নামতে পারে না।” কারণ নদীও বদলে যায়, মানুষও বদলে যায়। রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য। একই সিংহাসনে কেউ দ্বিতীয়বার বসলেও, সেটি আর আগের সিংহাসন থাকে না; কারণ ইতিহাস ইতোমধ্যেই সামনে এগিয়ে গেছে।
স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় ভুল এখানেই। তারা মনে করে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করলেই ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু ইতিহাস কোনো রাষ্ট্রযন্ত্রের অধীন নয়। ইতিহাস মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং সময়ের সমষ্টিগত বিবেক। এই বিবেককে বন্দি করা যায় না।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল সময়কে বন্দী করে রাখা যায় না। কালে কালে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারীরা প্রায়ই প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখেন, তাদের অনুসারীরাও সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করেন কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ স্রোত দেখায় পতনের পর কোন স্বৈরাচার আগের অবস্থায় আসতে পারে না। সমাজ বদলায় এমনকি মানুষের স্মৃতি বদলায়। 

ইতিহাসের চাকা সামনে ঘুরে। সে কখনোই একই যুগকে দ্বিতীয়বার নির্মাণ করে না। যে শাসন একবার ইতিহাসের বিচারে পরাজিত হয়েছে তার জন্য সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো অতীতকে পূর্ণ দখল করা যায় না। 

ইতিহাস নতুন অধ্যায় লেখে, পুরনো অন্যায়ের অনুলিপিও নয়। আর এ কারণেই ইতিহাসের প্রকৃতি শিক্ষা ব্যক্তি নয়, পরিবর্তন; ক্ষমতা নয়, সময় এবং ভয়ের নয়, জনগণের চূড়ান্ত রায়।

 

মুহতাসিম আলম মারুফ
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি