রাজনীতি
এনসিপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে আসিফ মাহমুদের, ঢাকা-১০ আসনে নির্বাচনের গুঞ্জন
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। উপদেষ্টা পদ ছাড়ার পর তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে আসতে চান-এ নিয়েই মূলত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। তবে এনসিপি নেতৃত্ব আসিফের প্রত্যাশিত পদ দিতে অনাগ্রহী।
আসিফের অনুসারীরা চাইছেন, তাকে দলের ‘মুখ্য সমন্বয়কারী’ পদে নিয়োগ দেওয়া হোক। বর্তমানে এই পদে দায়িত্বে আছেন নাগরিক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ও এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনিই দলটির স্ট্র্যাটেজিক লিডার হিসেবেও কাজ করছেন। এই পদ না পেয়ে আসিফ মাহমুদ সম্প্রতি পুনরায় সক্রিয় করেছেন স্থগিত থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের কমিটি, যা এনসিপি ও এর সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে-আসিফের ইঙ্গিতেই গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের সাবেক আহ্বায়ক ও ‘৯ দফা অভ্যুত্থান’-এর ঘোষক আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বে নতুন একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। যদিও কাদের বর্তমানে এনসিপি বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের কোনো পদে নেই।
এনসিপির একাধিক সূত্র জানায়, অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ আসিফ মাহমুদ সম্প্রতি দলটির প্রতি তার আগের মতো সহায়তা দিচ্ছেন না। এনসিপির অভ্যন্তরে কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন-আসিফ “অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা” করছেন।
গতকাল (রোববার) আসিফ মাহমুদ ঢাকার-১০ আসনে ভোটার হওয়ার আবেদন করেছেন। গুঞ্জন রয়েছে, তিনি এই আসন থেকেই জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চান। ওই আসনে এখনো বিএনপি কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। শুরুতে কুমিল্লা-৩ আসনে নির্বাচনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সেখানে বিএনপি জনপ্রিয় নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ-কে মনোনয়ন দেওয়ায় আসিফ ঢাকা-১০ এ মনোনিবেশ করছেন।
৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। পরে নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দল গঠনের প্রক্রিয়ায় পেছন থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন আসিফ মাহমুদও।
প্রাথমিকভাবে উপদেষ্টারা নির্বাচন করবেন না বলে জানালেও পরে সিদ্ধান্ত বদল হয়। এখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ পদত্যাগ করে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে।
এনসিপির অভ্যন্তরে বর্তমানে আরেকটি বড় বিতর্ক চলছে-দলটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেবে, নাকি জোটগতভাবে। গত শুক্রবার বাংলামোটরের রূপায়ন ট্রেড সেন্টারে অনুষ্ঠিত দলটির সাধারণ সভায় এই বিষয়েই দীর্ঘ আলোচনা হয়।
বৈঠকে বেশিরভাগ সদস্য জোটে না গিয়ে একক নির্বাচনের পরামর্শ দেন। তাদের মতে, জোট করলে স্বল্পমেয়াদে কিছু আসন পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে এনসিপির অবস্থান দুর্বল হবে। অন্যদিকে এককভাবে অংশ নিলে ব্যর্থতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না-যেমনটি হয়েছিল ডাকসু নির্বাচনে দলটির ছাত্রসংগঠন বাগছাসের ক্ষেত্রে।
জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান ও ইসলামী রাজনীতির কারণে অনেক নেতা তাতে আপত্তি জানান। ফলে এনসিপি এখনো জোট বা একক নির্বাচনের সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি।
একাধিক শীর্ষ নেতার মতে, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনসিপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আসিফের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, এটা সত্য। এখন তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে-তিনি অভ্যুত্থানের শক্তির সঙ্গে থাকবেন, না ক্ষমতার সঙ্গে।”