সারাদেশ

‘নদী আমাগো ভিটামাটি নিয়া গেল, বাজানরেও ছাড়লো না’- কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিজান


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

‘নদী আমাগো ভিটামাটি নিয়া গেল, বাজানরেও ছাড়লো না’- কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিজান
ছবিঃ সংগৃহীত

‘নদী আমাগো ভিটামাটি নিয়া গেল। সেই সঙ্গে আমাগো বাজানরেও ছাড়লো না। দুইটা টিনের ঘর, দুইটা আমগাছ আর একটা কাঁঠাল গাছ কেটে নেওয়ার আগেই নদীতে চলে গ্যাইছে। বাকি ঘর সরানোর সময় নদীর দিকে তাকিয়ে বাজান হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল। এরপর আর একটা কথাও কইলো না। আমাগো বাজান আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালামের ছেলে মিজান মিয়া (২৫)।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল ৭টার দিকে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে বসতঘর সরানোর সময় নদীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আব্দুস সালাম (৪৫)। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথেই তার মৃত্যু হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, উজানের ঢল ও পানি বৃদ্ধির কারণে তিস্তার পশ্চিম তীরে চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন চলছে। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী অব্যাহতভাবে তীর ভাঙছে। বসতবাড়ি, গাছপালা ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

ভাঙনের কারণে কৃষকদের বাদাম, আমনের বীজতলা, মরিচ, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, পাট ও ভুট্টার ক্ষেত ইতোমধ্যে নদীতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিস্তার পানি বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ, চর তৈয়বখাঁ, চর চতুরা, চর রামহরি এবং ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁ ও চর গতিয়াসাম এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম জানান, গত চার দিনে চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রামের অন্তত ৮ থেকে ১০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে চর বিদ্যানন্দ গ্রামের মমিনুল ইসলাম, আব্দুস সালাম, কাফি ও জয়নালের বাড়ি সম্পূর্ণ নদীতে চলে গেছে। এছাড়া চর তৈয়বখাঁ গ্রামের ফখরুল ইসলাম ও আব্দুর সাত্তারের বাড়িও ভাঙনের কবলে পড়েছে।

চর তৈয়বখাঁ গ্রামের ফখরুল ইসলাম বলেন, “এই নিয়ে তিনবার আমার বাড়িঘর নদীতে চলে গেল। এখন থাকার মতো আর কোনো জমি নেই। কোথায় যাব, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।”

চর বিদ্যানন্দ গ্রামের মমিনুল ইসলাম বলেন, মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ভাঙন পূর্বচর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মসজিদের একেবারে কাছে চলে এসেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এছাড়া দুই শতাধিক পরিবার বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বুধবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদীতীর রক্ষায় প্রায় ৩০টি পয়েন্টে দুই লাখ জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে চরাঞ্চলে কাজের জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকায় সেখানে এখনো প্রতিরোধকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মোজাহিদ বলেন, ভাঙনের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।