সারাদেশ
জাহানারা বেগমের মানবেতর জীবন, মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিচ্ছেন দেশি ও প্রবাসীরা
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ঘরহীন, সম্বলহীন এক বৃদ্ধার মানবেতর জীবনের অবসান ঘটিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে এগিয়ে এসেছেন একদল মানবিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও স্থানীয় সচেতন মানুষ। রৌমারী ইউনিয়নের কড়াই কান্দি (চুলিয়ার চর) গ্রামের বাসিন্দা মোছাঃ জাহানারা বেগম, যার দিন কাটত মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পেতে, এবার তিনি পেতে যাচ্ছেন একটি স্থায়ী ঠিকানা ও নিরাপদ আশ্রয়।
মৃত রহেজ উদ্দিন ও বাদের জান খাতুনের মেয়ে জাহানারা বেগম চরম দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট। তার নিজের এক খণ্ড জমিও নেই, নেই কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই। দীর্ঘ দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে কিংবা অন্যের বারান্দায় অবর্ণনীয় কষ্টে দিনাতিপাত করছিলেন তিনি। পেটের দায়ে তাকে বেছে নিতে হয়েছিল ভিক্ষাবৃত্তি। বিশেষ করে বর্ষার বৃষ্টি আর উত্তরবঙ্গের হাড়কাঁপানো শীতে তার দুঃখের সীমা থাকত না। জরাজীর্ণ এক টুকরো প্লাস্টিক বা ছেঁড়া কাপড়ই ছিল তার একমাত্র সম্বল।
জাহানারা বেগমের এই দুঃসহ মানবেতর জীবনের চিত্রটি সর্বপ্রথম নজরে আসে করতিমারীর বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আব্দুর রহিম মাস্টারের। তিনি বৃদ্ধার কষ্টের কথা শুনে ব্যথিত হন এবং বিষয়টি জনসম্মুখে আনার উদ্যোগ নেন। তিনি দ্রুত প্রবাসে থাকা রৌমারীর কৃতি সন্তানদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং জাহানারা বেগমের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
আব্দুর রহিম মাস্টারের আহ্বানে সুদূর প্রবাসে থেকে প্রথম সাড়া দেন সৌদি আরব প্রবাসী রোস্টার সুমন এবং মালয়েশিয়া প্রবাসী রবিউল ইসলাম। তারা দুজনে মিলে এই অসহায় নারীর জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাদের এই মহতী উদ্যোগে উৎসাহিত হয়ে প্রবাসে থাকা আরও কয়েকজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা বেশ কয়েকজন হৃদয়বান ব্যক্তি (বাংলাদেশি) আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। দেশি ও প্রবাসীদের এই অভূতপূর্ব মেলবন্ধন প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা থাকলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
বর্তমানে সকলের সম্মিলিত অর্থায়নে জাহানারা বেগমের জন্য একটি টেকসই ঘর নির্মাণের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে। মিস্ত্রি ও সরঞ্জাম নিয়ে কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। শিগগিরই তার দীর্ঘদিনের গৃহহীন জীবনের অবসান ঘটবে এবং তিনি একটি নিরাপদ আশ্রয়ে শেষ বয়সে একটু শান্তিতে থাকতে পারবেন।
উদ্যোক্তা রোস্টার সুমন ও রবিউল ইসলাম জানান, "আমরা প্রবাসে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি করলেও আমাদের মন পড়ে থাকে দেশের মাটিতে। আব্দুর রহিম মাস্টারের মাধ্যমে যখন আমরা জাহানারা বেগমের কথা শুনলাম, তখন আমাদের মনে হয়েছে তার জন্য কিছু করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা চেষ্টা করছি যাতে তিনি ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই পান এবং একটু সম্মানের সাথে বাঁচতে পারেন। যারা দেশে থেকে এবং প্রবাস থেকে আমাদের এই কাজে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন, আমরা সকলের কাছে কৃতজ্ঞ।"
এই মানবিক কাজের প্রশংসা করে স্থানীয় সচেতন মহল জানান, সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় বসে না থেকে এভাবে যদি সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী এবং সচেতন মানুষরা আব্দুর রহিম মাস্টারদের মতো এগিয়ে আসেন, তবে সমাজে কোনো মানুষকেই আর গৃহহীন বা অনাহারে থাকতে হবে না।
উল্লেখ্য, মোছাঃ জাহানারা বেগম কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ডাকঘরের (৫৬৪০) অন্তর্গত কড়াই কান্দি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা।