রাজধানী
ভূমি অফিসে বোরকা পরে হাজির ঢাকা জেলার ডিসি
ভূমি অফিসে প্রতিদিনের মতোই ছিল সাধারণ মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন জমির নামজারি করতে, কেউবা নিজের আবেদনের অগ্রগতি জানতে। সেবাপ্রত্যাশী মানুষের সেই ভিড়েই বোরকা পরে সাধারণ নারীর বেশে চুপিসারে প্রবেশ করেন এক নারী। পরিচয় জানতে চাইলে নিজেকে সাধারণ একজন সেবাগ্রহীতা হিসেবেই পরিচয় দেন তিনি। তবে কিছুক্ষণ পরই প্রকাশ পায় তার আসল পরিচয়-তিনি আর কেউ নন, ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম।
সরকারি ভূমিসেবার কাগজে-কলমের চিত্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষ বাস্তবে কতটা সহজে সেবা পাচ্ছেন, তা সরাসরি যাচাই করতেই নিজের পরিচয় গোপন করে উত্তর খান ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান জেলা প্রশাসক। সাধারণ একজন সেবাগ্রহীতার ছদ্মবেশে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তিনি ভূমিসেবা নিতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের অভিজ্ঞতার কথা শোনেন।
পরিদর্শনের সময় সেবাগ্রহীতারা ভূমি অফিসে এসে কোনো ধরনের ভোগান্তি, অযথা বিলম্ব, অনিয়ম কিংবা হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না, তা জানার চেষ্টা করেন ডিসি ফরিদা খানম। শুধু মানুষের কাছ থেকে তথ্য নেওয়াই নয়, তিনি নিজেও একজন সাধারণ সেবাগ্রহীতার মতো ভূমি অফিসের সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। এতে একজন সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে সেবা পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা বোঝার সুযোগ পান তিনি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পরিদর্শনকালে ভূমি অফিসের সার্বিক কার্যক্রমও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন জেলা প্রশাসক। সেবা নিতে আসা মানুষের সঙ্গে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ কেমন, প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্দেশনা তারা যথাযথভাবে পাচ্ছেন কি না এবং দাপ্তরিক প্রক্রিয়াগুলো সাধারণ মানুষের জন্য কতটা সহজ বা জটিল-এসব বিষয়ও তিনি খতিয়ে দেখেন।
এ সময় ভূমি অফিসে উপস্থিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও অভিজ্ঞতার কথাও শোনেন তিনি। বিশেষ করে সেবা পেতে কত সময় লাগছে, কোনো ধাপে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হচ্ছে কি না এবং সেবাগ্রহীতাদের কোথাও হয়রানি বা বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে কি না-এসব বিষয়ে সরাসরি তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করেন জেলা প্রশাসক।
পরিচয় গোপন রেখে একজন সাধারণ নাগরিকের মতো ভূমি অফিসে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সরকারি সেবার বাস্তব পরিস্থিতি জানতে জেলা প্রশাসকের এমন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষকে দ্রুত, সহজ ও হয়রানিমুক্ত ভূমিসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। সেবা নিতে এসে কোনো নাগরিক যেন অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির শিকার না হন, সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, শুধু অফিসে বসে প্রতিবেদন, নথি কিংবা অভিযোগের ওপর নির্ভর করলে সবসময় সরকারি সেবার প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয় না। মাঠপর্যায়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা সরাসরি জানার মাধ্যমে সেবার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। আর পরিচয় প্রকাশ না করে সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়ালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাভাবিক আচরণ এবং সেবাগ্রহীতাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতা আরও কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
জেলা প্রশাসকের এমন গোপনীয় পরিদর্শনের মাধ্যমে ভূমি অফিসের সেবার মান, মানুষের ভোগান্তি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।