পরিবেশ-জলবায়ু
বন উজাড়ে বাড়ছে বিপর্যয়ের ঝুঁকি, দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ জাতিসংঘের
বিশ্বজুড়ে বন উজাড় ও বনভূমির অবক্ষয় উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু সংকটের প্রভাব মোকাবিলার সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে বন সংরক্ষণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি পুনরুদ্ধারকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য বিশ্বের সরকারগুলোর প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।
এফএওর সর্বশেষ প্রতিবেদন ‘স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস ফরেস্টস’-এ বিশ্বের বনভূমির বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি বিলুপ্ত হয়েছে। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ বনভূমি বিভিন্ন কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ ও বন পুনরুদ্ধারে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। গত দুই দশকে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শতকোটি হেক্টরেরও বেশি জমি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্যের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকাতেও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। এফএওর মতে, এই অগ্রগতি শুধু ধীরই নয়, অঞ্চলভেদে অসমও। একই সময়ে খাদ্য, জ্বালানি, কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদের বৈশ্বিক চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।
বর্তমানে পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বনভূমিতে আচ্ছাদিত। এর পরিমাণ প্রায় ৪১৪ কোটি হেক্টর। এসব বনভূমি পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং স্থলভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ জীববৈচিত্র্যের প্রধান আবাসস্থল হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বনভূমিতে প্রায় ৭১৪ গিগাটন কার্বন সঞ্চিত রয়েছে, যা জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু পরিবেশ রক্ষাই নয়, মানুষের জীবন ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও বনভূমির সম্পর্ক গভীর। বন বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র ও পানি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে তাদের জীবিকা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য বনভূমির ওপর নির্ভরশীল।
তবে বনভূমির ওপর চাপ দিন দিন আরও বাড়ছে। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ হেক্টর বনভূমি দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কীটপতঙ্গের আক্রমণ, বিভিন্ন রোগবালাই এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য জলবায়ুগত পরিবর্তন অনেক অঞ্চলের বনকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
বাণিজ্যিক কৃষির সম্প্রসারণও বন উজাড়ের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষিজমি বাড়ানোর পাশাপাশি নগরায়ণ, অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবেশ দূষণ, জীবাশ্ম জ্বালানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ বনভূমির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে একদিকে বনভূমির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে অবশিষ্ট বনগুলোর পরিবেশগত সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এফএও বলছে, কাঠসহ বিভিন্ন বনজ পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু এসব পণ্যের টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতার সঙ্গে চাহিদার যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, তা বড় ধরনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর প্রভাব শুধু পরিবেশের ওপরই পড়ছে না; বননির্ভর অর্থনীতি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি বলে প্রতিবেদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বন পুনরুদ্ধারের ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে পরিবেশের পাশাপাশি অর্থনীতি ও মানুষের জীবনেও বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এফএওর হিসাব অনুযায়ী, শতকোটি হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত জমি সফলভাবে পুনরুদ্ধার করা গেলে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হতে পারে।
এফএওর মহাপরিচালক কু দোংইউ বলেন, বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারকে শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি স্থিতিশীল কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিনিয়োগ। তার মতে, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, বন পুনরুদ্ধারে বিলম্ব কিংবা অপরিকল্পিত উদ্যোগ ভবিষ্যতে ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে, সামাজিক বৈষম্য আরও তীব্র করতে পারে এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি রক্ষা ও পুনরুদ্ধার এবং অন্যদিকে ভূমিভিত্তিক পণ্যের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে এখনই বড় পরিসরে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তা মূলত বিশ্ববাসীর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে-বন রক্ষা এখন আর শুধু পরিবেশবাদীদের দাবি নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবিকা এবং জলবায়ু স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বন উজাড়ের গতি কমানোর পাশাপাশি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি দ্রুত পুনরুদ্ধার করা না গেলে ভবিষ্যতে এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত খরচ আরও বাড়তে পারে।